Wednesday, December 16, 2009

দেশীয় সাহিত্য বিকাশের অন্তরায় সমূহের বিচার

সাহিত্য এমন এক কাণ্ড যার কোনো সীমানা নাই। বলা ভাল সীমানা মানে না। কারণ সাহিত্য হচ্ছে সবচে মৌলিক প্রার্থনা। কোথাকার এক হোমার তাঁর প্রভাব আজও বিদ্যমান। ওমর খৈয়ম, হফিজ, কিটস, ইএটস, এলিয়ট, কভাফির কবিতার প্রভাব আজও দেখা যায় রবীন্দ্রনাথে, জীবনানন্দে। কারণ সাহিত্যের ব্যাপ্তি জগতের সকল বস্তুর ভেতর বিদ্যমান। ভাবের হাত ধরে ভাব ছড়িয়ে পড়ে নিরন্তর অভাবের সীমানাহীনতায়।
কিন্তু যখন কালের বর্জ্যস্রোতে ভেসে যায় মানুষ, পুরোদেশ যখন ডুবে যেতে থাকে ডুবন্ত কোনো জাহাজের মত তখন স্রোতের ভেতর ডুবে যাওয়াই যেন এদেশের সাহিত্যিকদেরও নিয়তি। তেমনি নিয়তিকেই বরণ করে নিয়েছে এ দেশীয় সাহিত্যিক সম্প্রদায়। এদেশের প্রত্যেক সাহিত্য সেবিরাই এখন সাহিত্যের শত্রু। তারা সকলে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে কীভাবে বাংলাদেশী সাহিত্যকে সংকীর্ণ থেকে আরো সংকীর্ণ, স্থূল থেকে আরো স্থূলত্বের দিকে নিয়ে যাওয়া যায়। এ অবস্থার জন্য শুধু লেখককুলের ওপর দোষারোপ করলে একচোখে দেখা হবে। আরো দায়ী ভাগ পরবর্তী যোগ-বিয়োগ।
এ ব্যাপার নিয়ে কোনো তর্কই হতে পারে না যে বাংলাদেশীরা পঁয়ত্রিশ বছরের এক মেরুদন্ডহীন জাতি। ব্রিটিশরা চলে যাবার পর এই জাতির ভেতর এমন একজন মানুষও জন্মাননি যাকে ঐতিহাসিক অনুকরণীয় চরিত্র বলা যেতে পারে। তাদের বড়জোর গ্যাংস্টার ও বিদেশীদের এজেন্ট বলা যায়। এরা সাহিত্য, ইতিহাস, ধর্ম সবকিছুকেই বিকৃত করেছে। এদের কোনো সংস্কৃতি ছিল না। এখনো নাই। তলাকার কালো রাজনীতির প্রভাব পড়েছে সবখানে দুরারোগ্য রোগের উপসর্গ হয়ে। সবখানে একটা অদৃশ্য ক্ষুদ্র স্বার্থপরতার জাল টানা আছে। এদেশের সাহিত্যে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মত কোনো ছোট কাগজের আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। যে কারণে তারা প্রতিষ্ঠিত ধনী প্রকাশনাগুলোকে তোয়াক্কা না করে নিজেদের মত স্বাধীন কাজ করে যেতে পারছে। ষাটের দশকের সাহিত্য পত্রিকা কন্ঠস্বর সম্পর্কে পত্রিকাটির সম্পাদক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ গর্ব করে বলেন তিনি এদেশের সাহিত্যে নতুন একটি যুগের নেতৃত্ব দিয়েছেন। ষাটের এই পত্রিকাটিতে যারা লিখত তারা সবাই আজ তারকা। এ কথাটি সত্য কন্ঠস্বরে যারাই লিখত সবাই আজ তারকা, কেউ লেখক হননি। সকলেই প্রায় মাধ্যমিক স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের প্রেম নিবেদন করার বাণী লেখা অনেক সহজ করে দিয়েছেন। এদের উপর মূলত প্রভাব পড়েছিল কলকাতার পঞ্চাশের লেখক গোষ্ঠীর। তাদের ওপর ছিল আমেরিকান বিট জেনারেশনের। পঞ্চাশের দশকে কলকাতায় বিট গোষ্ঠীর হোতা গীন্সবার্গ এলে তাদের অপ্রাতিষ্ঠানিক ধারাটার প্রভাব পড়ে পঞ্চাশের লেখকদের ওপর। গীন্সবার্গকে যথাযতভাবে গ্রহণ করতে পারলে না হয় কথা ছিল। সাহিত্যে এবং চালচলনে গীন্সবার্গের প্রধান বৈশিষ্ঠ্য ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে চুড়ান্ত নাজেহাল করা। ধনতন্ত্রের পালিশ করা আত্মাহীন মার্কিন মুলুকের অহংকারী অন্তসারশূন্যতাকে খুলে দেখানোই ছিল তাদের লক্ষ্য। তারা ছিল ভোগের বস্তিতে নিঃশ্বাস নিতে না পারা প্রজন্ম। কিন্তু কলকাতার সংকটসংকুল নিম্নমধ্যবিত্ত কবিরা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে বিট জেনারেশনকে অনুকরণ করতে গিয়ে নিজেদেরকে লক্ষ্যহীন স্থুলতায় নিক্ষেপ করলো। বেশ্যাদের তিরিশেই গ্রহণ করেছিল আধুনিকেরা। পঞ্চাশীরা যে কোনো বয়সের যে কোনো নারীকে এমনকি মা মেয়েকেও একসাথে ভোগ করবার স্বপ্ন দেখতে থাকে সারাদিন। এবং এই গোষ্ঠীটি এতবেশি প্রচার পেয়েছিল যে পরবর্তী একযুগ এরা রাজত্ব করল শতশত রিম কাগজে। পুরো একযুগ মহান সাহিত্যের ধারেকাছেও যেতে পারলনা পাঠক। ঠিক এই গোষ্ঠীটির প্রভাব পড়েছিল এই কন্ঠস্বর পত্রিকায়। সেটা কন্ঠস্বর পত্রিকার প্রথম সংখ্যার ইশতেহারটা পড়লে বুঝা যায়। এরা লিটল ম্যাগাজিন করবার ধারাটাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়ে যায়।
এরপর থেকে এদেশে লিটল ম্যাগাজিন করে আত্মহারা, স্বমেহী লোকজন। তারা ছোট কাগজ করে দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতার সাংবাদিকদের অপাঠ্য না-কবিতা ছাপানোর জন্য। ঘনিষ্ঠতার সূত্রে যেন তার একটা কবিতা ঐসব পত্রিকার রঙ্গিণ বিজ্ঞাপনের পাশে ছাপানো হয়। আর অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে কজনের টাকায় ওই ছোট কাগজ ছাপা হয় তাদের নিজেদের তোয়াজ তোষণে ভরা। এসব গ্রাম্য মানসিকতার অ্যামিবা লেখকেরা এত অল্পে তুষ্ট যে তারা মনে করে যেখানে কালোবাজারী কালোচশমাধারী পেশাদার খুনী ও উচ্চবিলাসী সিনেমা নাটুকে বেশ্যাদের ছবি ছাপা হয়, তার পাশে তার একটা লেখা ছাপানো মানে জীবন ধন্য হয়ে গেল। আর বর্তমানে বাংলাদেশে যেসব মহাপণ্ডিতেরা সাহিত্য পাতাগুলোতে সাংবাদিকতা করে তাদের নামে কিছু লেখা সাহিত্যপরিপন্থী কাজ হবে। এদের সাহিত্যের প্রতি কোনো কমিটমেন্ট নাই, দরকারও নাই তাদের। কারণ তাদের ছলনা সম্পর্কে তারা জ্ঞাত।
এক পত্রিকার এরকমই এক প্রাণীকে একবার বলতে শুনেছিলাম। রিলকের ‘সরলা ইরিন্দিরা’ (Innocent Eréndira) বইটা নাকি তার ভাল লেগেছিল। তাকে আর বইটার লেখকের নাম বলা হয়নি। আরেকজনকে দেখেছিলাম ভাগযোগ করে নবাগত এক কবিকে বোঝাচ্ছেন কবিতা হচ্ছে আসলে চার মাত্রার খেলা। প্রাণীগুলো আবার নিজেদের মনে করে এজরা পাউন্ড, এলিয়ট, বুদ্ধদেব, সুধীন ইত্যাদির মত সম্পাদক। কয় অক্ষরে অরবৃত্ত হয় এটাই হচ্ছে এদের কবিতা মাপার মাপকাঠি। গল্পকে তারা মনে করে মানিক, তারাশংকরের মত কিনা যেন পৃথিবীতে আর কোনো ইতালো কালভিনো, বোর্হেস, পিটার বিকসেল, রমানাথ রায় গল্প লিখেন নি। প্রত্যহ একটা দৈনিকের সাহিত্য পাতায় যা ছাপা হয় তার বৃহদাংশজুড়ে থাকে কপট সাহিত্য সম্পাদকের আত্মীয়-স্বজন,ভাই-বেরাদর, শ্যালক, তাদের নিয়মিত হাজিরা দেনাঅলা পা’চাটা সরীসৃপদের।
দৈনিক পত্রিকা হচ্ছে দৈনিক পত্রিকা। সারাদিনের খুন ধর্ষণ ও যাবতীয় পণ্যের বিজ্ঞাপনে ভরা। সে সাহিত্যের কাছে দায়বদ্ধ নয়। ব্যবসাই তার লক্ষ্য। যেটা এদেশের প্রথম শ্রেণীর পত্রিকাগুলোর অন্যান্য ব্যবসাবাণিজ্য প্রসারের তোড়জোড় দেখলে বুঝা যায়। কিংবা সুক্ষমাথার দূর্ণীতিবাজ ব্যবসায়ীরা নিজেদের কালোটাকা সাদা করবার জন্য এই সব পত্রিকা করেছ। যেনতেনভাবে পৃষ্ঠা ভরানোই হচ্ছে তার কাজ। দেশের সাহিত্যের মেরুদণ্ড কীরকম নড়বড়ে হলে, কী রকম প্রতিশ্রুতিশীলতার অভাব হলে একটা দেশের সকল লেখকরাই এই দৈনিকের পাতাগুলোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এ এক বিরাট প্রশ্ন।
পুঁজির ক্ষমতা আছে সে মুহ’র্তেই প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে যেতে পারে। তাই এই স্বজনপ্রীতি, স্বেচ্ছাচারিতা, মূর্খামির জঘন্য প্রভাব পড়ে মফস্বলে। যেখানে ভাল বই পৌছেনা। আর এসব সাহিত্য পাতায় লেখাটেকা দেখে লোকজন ভাবে যে এগুলোই বুঝি সাহিত্য। এবং নামগুলোর দিকে তাকিয়ে তারা ভাবে এরাই বুঝি সাহিত্যিক। ঢাকায় যাদের লেখা ছাপা হয় তারা ছাড়া এসব লেখা অন্য কেউ দেখে কিনা সন্দেহ প্রকাশ করি।
পাকিস্তান আমল হতে এদেশে এমন পনেরটা বইও ছাপা হয় নাই যেগুলো পড়ে শেলফে সংরক্ষণ করা যায় পরবর্তীতে পড়ার জন্য । একাত্তর পরবর্তী এদেশে যারাই ক্ষমতা পেয়েছে গণগ্রন্থাগার গুলোকে ব্যবহার করেছে অশিতি আমলা ও প্রেসিডেন্ট অথবা প্রধানমন্ত্রী পদবাচ্যের আত্মীয়-স্বজনদের অপাঠ্য হজ্বে যাবার স্মৃতি, জিয়ার দর্শন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন জাতীয় আবর্জনা রাখবার ডাষ্টবিন হিসাবে। আর এসব বই সরকারী টাকায় ছাপানো সরকারী টাকায় কেনা।
কবিতার অবস্থা সত্যিকার অর্থে বলতে গেলে কবিতাহীন দানোয় পাওয়া এক ঘোরের ভেতর তাদের বাস। তাদের কবিতার ভেতর কবিতা ছাড়া সব আছে। আর যে গল্পগুলো এখন এখানে ছাপা হচ্ছে তাদের ফর্ম হচ্ছে মান্ধাত্বার মায়ের আমলের। তাদের অভিজ্ঞতা একটা কুনোব্যাঙের চাইতেও কম। তবু হরদম মেলা আসলে অন্ধ দানবের মত রিমরিম কাগজে এসব … ছেপে বেচঁতে আসে বটতলার বাজারে। দৈনিক পত্রিকাগুলো সের দরে তারকা বানায় ও বেঁচে। এটা তাদের একধরনের পত্রিকা কাটতি ব্যবসায়। আর এসব প্রাণীগুলো তারকা হবার আশায় সবকিছু জলাঞ্জলি দিতে পারে মায় আত্মা পর্যন্ত। আদর্শহীনতাই এখানে আদর্শে পরিণত হয়েছে।
আদর্শ বলতে এখানে কোনো দার্শনিক বা ধর্মীয় চিন্তাধারাকে বুঝানো হচ্ছে না। সাহিত্যের একটা নিজস্ব আদর্শবোধ আছে। যা জগতের তাবত মতবাদের ঊর্ধ্বে ও তাবত মতবাদের চাইতে সত্য। কারণ সত্য উচ্চারণ ছাড়া সাহিত্যের আর কোনো কাজ নাই। সাহিত্যের আদর্শ জগতের শ্রেয় আদর্শ। একজন সৎ সাহিত্যিক ত্রিকালদর্শী। যে কারণে লু স্যুন ডাক্তারী ছেড়ে লিখতে আসে। যে কোনো ধর্মপ্রণেতার চাইতেও তিনি মহৎ।
এ বড় আজব দেশ। গ্রামদেশ থেকে কবিতা লিখতে আসা একটা শাদা ছেলে চক্রে পড়ে পরিণত হয় হাস্যকর ভাঁড়ে অথবা আত্মাহীন বেশ্যার দালালে। এসব হতে চেয়েছিলাম লেখকদের সবসময় দেখা মিলবে দৈনিক পত্রিকাগুলোর সাহিত্যপাতার সাংবাদিকদের পশ্চাতে।
কিছুদিন শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদকে তারকা বানিয়ে খুব বিক্রি করেছে দৈনিক পত্রিকাগুলো। সন্দেহ নাই একসময় ভাল কয়েকটা কবিতা লেখার চেষ্টা করেছিলেন শামসুর রাহমান। কিন্তু শেষের দিকে শামসুর রাহমানের ভিমরতি হয়েছিল। বাজারের ফর্দ, ঔষধের স্লিপ থেকে শুরু করে যা-তা কবিতার নামে চালিয়ে অচিরেই একটা নিকৃষ্ট ভাঁড় ও বিরক্তিকর চরিত্রে পরিণত করেন নিজেকে। তাঁর শত্রুরা আর তোশামোদ কারীরা হয়তো তাঁকে এসব পরামর্শ দিয়ে থাকবে। এই শামসুর রাহমান মরার পরও ভূতের মত প্রত্যহ উদয় হয় এইসব আবর্জনাময় দৈনিকের সাহিত্যপাতায়। এদের অধিকাংশই শামসুরের দ্বারা পত্রিকায় সাংবাদিকতা প্রাপ্ত। সাহিত্যপাতার এসব কেঁচো সম্প্রদায় বাস করে গর্তে। শামসুর রাহমান খুব রুচিহীন ট্রাডিশনাল লোক ছিলেন। রবার্ট ফ্রস্টের মত মহৎ কবিকে তিনি বাংলাভাষায় একেবারে ধ্বংস করে দিয়ে গেছেন। সেটা রবার্ট ফ্রস্টের মুল কবিতাগুলোর সাথে শামসুরের অনুদিত কবিতাগুলো মিলিয়ে পড়লে বুঝতে পারা যায়। তার অনুদিত ফ্রস্টের কবিতাগুলো পড়লে মনে হয় এদেশীয় চতুর্থ শ্রেণীর কবিরাও ফ্রস্টের চাইতে ভাল লেখে। তিনি পশ্চিমবঙ্গীয় আধুনিকদের অনুকরণে এসব করেছিলেন।
আর আল মাহমুদকে তো রীতিমত ভণ্ডপীর উপাধি দেয়া যেতে পারে। আত্মার গরিমাহীন যৌন উপোসী এই লোক কবিতার দোহাই দিয়ে জীবন সুদ্ধ চালিয়াতি করেছে। বাংলাদেশের প্রত্যেক গুণ্ডাপাণ্ডা, আর্মি স্বৈরাচার সরকারের পা-চাটা সে। তার কবিতা- গল্প- উপন্যাস পদবাচ্য পড়লে মনে হয় আদি রসাত্মক লেখক শ্রী রসময়গুপ্তই একমাত্র তার সমকক্ষ লেখক। নারীদেহকে তার মত এত নোংরা ও বিকৃতভাবে অন্য কোনো কলমধারী ব্যবহার করে নাই। ঐতিহ্য প্রকাশিত একটি সাক্ষাতকারের বইয়ে তিনি বলেছেন এখন নাকি কবিদের ধর্ষণ করার সময় এসেছে। এই বিকৃত মানুষটাই আবার ইসলামী সংস্কৃতির জিগির তোলে আর আত্মপ্রচারকালে রসিয়ে রসিয়ে বলে তারা নাকি আরব থেকে এসেছে। এদেশীয় মুসলমানদের ভেতর অনেক হীনম্মন্যতার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে তারা অধিকাংশই মনে করে যে তারা মহম্মদের বংশধর, তারা এসেছে আরব থেকে। কিন্তু যে কেউ নৃবিজ্ঞান না ঘেটেই চেহারা দেখেই বলে দিতে পারে মাহমুদ মঙ্গোলিয়ান প্রজাতির লোক। তার চেহারায় মঙ্গোলিয়ানদের ছাপ স্পষ্ট।
কবিতা হচ্ছে একই জীবনের অন্যরকম উৎসার এটা গভীরভাবে অনুভব করবার সময় এদের কারো হয়েছে বলে মনে হয় না। উনিশ শতক, পশ্চিমবঙ্গের দলিত গোষ্ঠী ও এদেশীয় গুটিকয় সাহিত্যিকদের বাদ দিলে এদেশীয় সাহিত্য এখনো শিশুসাহিত্য। একটা পয়ত্রিশ বছর বয়সী স্বাধীন দেশের সাহিত্যে যে পরিমাণ অগ্রগতি হওয়া উচিত ছিল তা তো হলইনা। একাত্তরের মত একটা এপিক ওয়ার যার শেকড় বায়ান্ন পর্যন্ত বিস্তৃত তা নিয়ে একটা মহৎ উপন্যাস পর্যন্ত লেখা হলনা। একাত্তর সম্পর্কে জানতে গেলে আমাদের একমাত্র সহায় মেজর(অব:)দের অপাঠ্য স্মৃতি কথা।
এদেশে সাহিত্য এখনো ফটকাবাজ তালিবাজ ও বটতলায় সীমাবদ্ধ। সন্দেহ নাই এ সাহিত্যকে উপরতলায় তথা আর্ন্তজাতিক মহৎ সাহিত্যের কাতারে নিয়ে যাওয়া সাহিত্যিকদের আরেকটি দায়িত্ব। যার কারণে বৈদেশিক ভাষা থেকে প্রচুর অনুবাদ হওয়া দরকার। কিন্তু বাংলাদেশের বেশিরভাগ অনুবাদকই ছোটলোক। অনুবাদ ক্ষেত্রে তাদের জালিয়াতি আতংকিত হবার মত। তাদের অনূদিত বইটি হাতে নিলে লজ্জা হয়। দেখা যায় বইটির সামনে পিছনে ফ্ল্যাপে অনুবাদকের নাম, ছবি, জীবনী ইত্যাদি ময়লা আবর্জনায় ভরপুর। অনেক সময় অনুবাদকদের এসব অপকর্মের দুর্গন্ধে মূল লেখককে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে।
কবীর চৌধুরীর মত অশীতিপর বৃদ্ধ অনুবাদকও এইসব অপকর্ম করেন নিয়মিত। আত্মপ্রচারের হীনমন্যতাবোধ, ছাপার অক্ষরে নিজের নাম দেখার শিশুসুলভ যৌনবাসনা এখনো আমরা পরিহার করতে পারি নাই। যেন মূল লেখকরা আমাদের বোন জামাই অথবা কাকা লাগে। ফলে হাতে নেয়ার পর মনে হয় এইরকম হীনমন্য এক লোকের অনুবাদ আর কী পড়ব। পড়ার রুচিটাই নষ্ট হয়ে যায়। আর কিছু অনুবাদক আছে আরো অসৎ ও দুর্নীতিবাজ। অর্ধেক লেখা বাদ দিয়ে বইটি ছেপে দেয়। যেন তাড়াহুড়ো করে ইতিহাসে স্থান করে নেয়া যায়। আর এসব ’হতে চেয়েছিলাম’ লেখকদের আবর্জনার স্তুপ ছেপে চলে বাংলাবাজার ও শাহবাগের প্রকাশকদল। অধিকাংশ প্রকাশকরা অশিক্ষিত। প্রকাশকদের মধ্যে শিক্ষিত মার্জিত লোক নাই বললেই চলে। কারণ এরা চাকরী করতো প্রেসে, বাইণ্ডিংখানায়। সহজে দুইপয়সা কামানোই হচ্ছে এসব জীবদের জীবনের ব্রত। একবার বাংলাবাজারের এক নামকরা প্রকাশকের কথা শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করছিলেন বড় পত্রিকার সাংবাদিক নয়, কলেজে পড়ায় না সে কী করে লেখক হতে পারে। তার ধারণা এ দুই পেশার লোক ছাড়া অন্য কেউ লেখক হতে পারে না। এরা আবার বিভিন্ন পেশার সাথে জড়িত। তারা ছাপে অন্য পেশার কন্ট্রাকটরের শালার বউয়ের ছোট ভাইদের কবিতার বই।
সুবিধা পেলে সাহিত্য সুদ্ধ পাইকারি বিক্রি করতেও তাদের বাধবে না। এইরকম একটা গুমোট হত্যাচক্রের ভেতর কখনোই মহৎ কবি সাহিত্যিক জন্মগ্রহণ করতে পারে বলে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।

হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুগ্রহণ ও কতিপয় জন্ম

‘সৃষ্টি করো সেই সব যা দেখে জনগণ বিদ্ধ করবে বিদ্রূপে। আর সেটুকুই হলে তুমি।’ — জাঁ ককতো
humaun_azad
আমরা কেউই আশা করিনি হুমায়ুন আজাদ (১৯৪৭-২০০৪) এত অচিরাৎ মৃত্যুকে গ্রহণ করবেন। আমরা বলতে যারা তাঁকে সেনাপতি জ্ঞান করতাম। বস্তুত পক্ষে তিনি শুধু প্রগতিশীল সমাজের সেনাপতিই ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলাদেশি চিন্তার একজন অভিভাবকও। এটা বুঝতেও আমাদের সময়ের দরকার হতে পারে। একটা ধাবমান অন্ধকার ছিল তাঁর আক্রমণের লক্ষ্যস্থল।
সাহিত্যের ইতিহাস মূলত অজ্ঞানতা আর অন্ধকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ইতিহাস। আর সমস্ত আবিষ্কার ভয় থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য। আগুন জ্বালানোর পর মানুষের ভয় অনেকখানি কেটে যায়। আলো সবসময় অন্ধকারের শত্রু। তবে আজাদের সময়ের সব চাইতে বড় অন্ধকার হচ্ছে অজ্ঞানের অন্ধকার। এটা প্রতিক্রিয়াশীল এবং সংক্রামক। উগ্র এবং আদেশপ্রবণ। অনেকটা দানবীয় তার স্বভাব। যার বিরুদ্ধে তিনি লড়েছিলেন। ভাবি যে হুমায়ুন আজাদ কি জানতেন না তাঁর শত্রুর অপশক্তি ও দেহকাঠামো সম্পর্কে? যদি তিনি তা জানার পরও সম্মুখসমরে লড়াই করতে মনস্থির করে থাকেন এবং লড়াই চালিয়ে যান আমৃত্যু, তাহলে তাঁকে অসম্ভব সাহসী, সৎ আলোকপ্রাপ্ত শহিদ সেনাপতি হিসেবে তকমা মারা যায়। হুমায়ুন আজাদের আঘাতের প্রক্রিয়া এত সরাসরি এবং এত সঠিক ছিল যে তাঁকে একমাত্র ফরাসি চিরবিদ্রোহী দার্শনিক মহাত্মা ভলতেয়ারের সাথেই তুলনা করা চলে। আর আমার বিশ্বাস, এই যুদ্ধে নামার আগেই তিনি মৃত্যুকে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি সক্রাতেসকে জানতেন, জানতেন ভলতেয়ারকে, জানতেন গ্যালিলিওকে, জানতেন হাইপেশিয়াকে। তাঁর স্থান অন্ধকারের বিরুদ্ধে এই সব সৈনিকদের কাতারে খোদাই হয়ে গেছে।
যদিও তাঁর প্রায় উপন্যাসে তিনি যৌনতাকে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন আধুনিকতার নাম করে, তবুও মনে হয় তিনি মেজাজে মার্ক্সীয় ছিলেন। সমগ্র পৃথিবী জুড়ে যেখানে লেখক-সাহিত্যিকরা নব্য সিনিসিজমে মেতে উঠেছেন, যখন তাঁরা পৃথিবীব্যাপী বোমার শব্দে জেগে উঠে বলেছেন, ‘অনেক ঘুমাতে চেয়েছি আমি’ এবং তারপর পাশ ফিরে শুয়ে পড়েছেন, সেখানে তিনি জেগে ছিলেন এবং নির্ভয়ে বিহার করে চলেছেন এই পোড়োজমিতে এবং হাঁকিয়ে চলেছেন সম্মুখ-রণাঙ্গনে।
তিনিও তো পারতেন প্রথম দুনিয়ার কোনো দেশের পুঁজির গোলামি করতে বা পালিয়ে যেতে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে। কিন্তু তিনি তা করেননি। এ থেকে আমরা সিদ্ধান্ত করতে পারি যে তিনি নিজেকে একা মনে করতেন না, তিনি নিজেকে সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার অংশ মনে করতেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ‘অন্ধ হলেই প্রলয় বন্ধ থাকে না’। তাঁর কবিতাগুলোকে দেখি বক্তব্যে ভরা আর প্রেমে মহীয়ান। যদিও মহাকালের চেয়ে কবিতায় তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সমকালের দিকে। তিনি ভবিষ্যদ্বাণী দিলেন : ‘সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’। আমাদের জন্য কত সত্য তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী! কবিতাকে তিনি ব্যবহার করেছেন অন্ধকার আর অজ্ঞানতার বিরুদ্ধে। এক হিসেবে সমস্ত কবিতাই তা-ই। জীবনানন্দ যখন অবিরাম মহাকালিক বেদনার দিকে তাকিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন, ‘তিমির হননে তবু অগ্রসর হয়ে’ — আমরা কি তিমিরবিলাসী? বস্তুত তাও অজ্ঞানতার বিরুদ্ধে যুদ্ধেরই মহামন্ত্র। তাঁর কবিতায় এক দিকে প্রেম অন্যদিকে চূড়ান্ত বিদ্রোহ। শান্তি এবং যুদ্ধ, প্রেম ও বিচ্ছেদ, জরা ও যৌবন এভাবেই এগিয়ে চলেছে পৃথিবী।
চৈতন্যে গ্রন্থিত হয়েছিলেন তিনি। এড়িয়ে যাননি কোনো দুঃসময়-দুঃশাসনকে। সামরিক একনায়কদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি লিখেছেন জলপাই রঙের অন্ধকার-এর মতো বই, ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল-এর মতো বক্তব্যপ্রধান উপন্যাস। লিখেছেন প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে, সীমাবদ্ধতার সূত্র। মূলত তাঁর কবিতা এবং প্রবন্ধ (ভাষা সংক্রান্ত সম্পাদনা, প্রবন্ধাবলি বাদে) ও উপন্যাসে উঠে এসেছে তাঁর স্ব-সংস্কৃতি-প্রগতির পথে প্রধান অন্তরায়সমূহের সমালোচনা। আর তিনি শুধু বিষয়কে উপস্থাপন করেননি, সাথে সাথে বিষয়সমূহকে রক্তাক্ত করেছেন। ধারালো তলোয়ার দিয়ে সেসবকে তিনি চেঁছে ফেলে দিতে চেয়েছেন। নতুন করে তিনি সম্পাদনা করেছিলেন আধুনিক বাঙলা কবিতা, নতুন করে সম্পাদনা করেছেন রবীন্দ্রনাথের কবিতা। মূলত তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিটাই ছিল অভিভাবক সুলভ। কিন্তু তিনি চপল বা চঞ্চল ছিলেন না। তাঁর বক্তব্যে আপাতগভীরতাও কম নয়। সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক প্রথায় সিদ্ধ হয়েও তিনি ছিলেন চূড়ান্ত প্রথাবিরোধী। কিন্তু তাঁকে কখনও রাগী তরুণ সম্প্রদায়ের লোক বলে মনে হয় না। চৈতন্যের দায় তাঁকে নাড়া দিয়েছিল।
জ্ঞান যাঁরা আহরণ করেন, মনে করি, তাঁরা সাথে সাথে আরও দুটি বস্তু আহরণ করেন : একটা হচ্ছে মারাত্মক কাণ্ডজ্ঞান, অন্যটা অসার কাণ্ডজ্ঞানহীনতা। কাণ্ডজ্ঞান একজন মানুষকে দায়বদ্ধ করে আর কাণ্ডজ্ঞানহীনতা তাঁকে করে তোলে আত্মপ্রেমে মাতোয়ারা। হুমায়ুন আজাদ প্রচণ্ড কাণ্ডজ্ঞানসম্বলিত ছিলেন। তিনি সবকিছুকে ঘেন্না করতে চেয়েছিলেন সবকিছুকে ভালোবেসে। তিনি কখনওই গ্রহণ করতে পারেননি এমন সাহিত্যকে যা সমাজকে স্থূলভাবে প্রকাশ করে। তিনি গ্রহণ করতে পারেননি মাথামোটা নেতাদের। তিনি বরদাস্ত করেননি চরিত্রহীন সাহিত্যিকদের। তিনি সহ্য করেননি সামরিক একনায়কদের। তিনি ছেড়ে দেননি সুবিধাবাদী আগাছা বুদ্ধিজীবীদের। সমস্ত অসাহিত্য, অপন্যাস, অকবিতার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার। মনঃতুষ্টির জন্য তিনি ছুটির দিনের অপন্যাস লেখেননি। লেখেননি কোনো দায়িত্বজ্ঞানহীন কাহিনি। তবে আক্রমণের পাশাপাশি তিনি অপেক্ষাকৃত বেশি মাত্রায় ব্যবহার করেছেন যৌনতাকে। মাঝে মাঝে তাঁর চরিত্রদের প্রতি সহানুভূতি রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তাদেরকে মনে হয় যৌনদানব। তবু তাদের প্রধান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হচ্ছে স্যাটায়ার। অতিমাত্রায় যৌনতার ব্যবহারও আসে এক ধরনের হতাশা থেকে, যেমন হতাশায় থাকলে মানুষ অতিমাত্রায় যৌনপ্রবণ হয়। তিনি নির্দিষ্ট কোনো মতবাদে বিশ্বাস করতেন না আগেই বলেছি, যদিও তিনি মেজাজে মার্ক্সীয় ছিলেন। তাঁর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ পাশ্চাত্য ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের মতো নয়। কেননা তিনি দায় এড়াতে পারেননি। এড়াতে পারেননি যে-সমাজে তিনি বাস করেন সেই সমাজকে। তাঁর উদ্ধত তলোয়ার ছিন্নভিন্ন করেছে বাঙালি মুসলমানকে। সমাজ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে ক্যাথলিক আর প্রোটেস্ট্যান্টদের মতো। হুমায়ুন আজাদ জন্ম দিয়েছেন অপক্ষাকৃত ধর্মীয় উদার মনোভাবের। ধর্ম সম্পর্কে বাঙালি মুসলমানের যে-অন্ধ রক্ষণশীল মনোভাব, সেটা থেকে তিনি বাঙালি মুসলমানদের পরিত্রাণ দিতে চাইলেন। যেখানে তাঁর মৃত্যু, সেখানেই অন্যার্থে তাঁর যাত্রা শুরু। তাঁর মৃত্যুর পর এখন অনেকেই তাঁকে নিরপেক্ষভাবে বুঝতে চাইবে।
চিন্তার জয় সেখানেই — তাঁর মৃত্যু নেই। তাঁর বই অন্য অনেক জনপ্রিয় অপন্যাসিকের চাইতেও কম বিকোয় না। কারা পড়ে তাঁর বই? বিশেষ করে পড়ে তরুণরা, পিছিয়ে পড়া নারীগোষ্ঠী। তিনি চেয়েছিলেনও তা-ই। তরুণদের ভেতর তিনি তাঁর চিন্তাসূত্র ঢুকিয়ে দিতে পেরেছেন, সেটাই তাঁর সফলতা। হুমায়ুন আজাদ যতটুকু কর্ষণ করেছেন, অন্য যে-কেউ সেখান থেকেই শুরু করতে পারে। তিনি তরুণদের জন্য পথটি অপেক্ষাকৃত সহজ করে দিয়ে গেছেন। এমন এক সমাজের কথা ভেবে তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন যে-সমাজে চিন্তার স্বাধীনতা নেই। যেন আমরা বাস করছি কতিপয় অন্ধ মানুষের ভিড়ে। প্লাতোনের সেই গল্পটার মতো। আমরা যেন সেই সব লোক যাদের দু’হাত পিছন দিকে বাঁধা। আমরা কেবল সম্মুখ দেখতে পারি। আমরা কেবল ছায়া দেখে দেখে ভাবি এটাই জগৎ, এটাই পৃথিবী। হুমায়ুন আজাদ সেই লোক যিনি বন্দিত্ব থেকে মু্ক্তি পেয়েছিলেন আর তিনি আমাদের মাঝে এসে বললেন, ‘দেখো, আমরা কেবল ছায়াকেই জগৎ ভেবেছি। আসল জগৎ অন্য রকম।’ আর আমরা দুর্ভাগারা তাঁকে সবাই মিলে হত্যা করেছি। হুমায়ুন আজাদ নিহত হননি। অনেকে বলতে পারেন, কিন্তু হুমায়ুন আজাদের সাথে যে-রকম ব্যবহার আমরা করেছি — বইমেলা প্রাঙ্গণেই মূলত তিনি মরে গেছেন চাপাতির কোপে। বাকি অর্ধেক মরেছে ধিক্কারে, ঘৃণায়; তাঁকে খুন করার প্রচেষ্টার পরও তাঁর পরিবারকে শান্তিতে থাকতে দেয়নি অন্ধকারের কৃমিরা। সরকার চিহ্নিত করতে পারেনি তাঁর আপাত-আততায়ীদের। সরকার দিতে পারেনি তাঁর পারিবারিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। শত্রুরা ফের তাঁর সন্তানকে ধরে নিয়ে যায় এবং হত্যার হুমকি দেয় । শত্রুদের ভয় কেবল তাঁর কলম আর দেখার চোখ। কিন্তু যা তিনি লিখে ফেলেছেন তা কী করে রুখবে তারা? যে-চিন্তার স্রোত তিনি প্রবাহিত করেছেন, কী করে বন্ধ করবে তারা তার প্রস্রবণ? তাঁর মৃত্যুর পর তিনি তলে তলে দ্বিগুণ শক্তিশালী। তাঁর লেখা নিয়ে নতুন করে ভাবছে মানুষ। তাঁর বই নতুন করে কেনার হিড়িক পড়েছে — কী লিখেছেন এই লোক যার জন্য হঠাৎ করে মরে যেতে হয়েছে!
কবিতা-উপন্যাস-প্রবন্ধ সব মিলিয়ে তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যাও কম নয়। শুধু হুমায়ুন আজাদ কেন, কোনো চৈতন্যসমৃদ্ধ মানুষই নিরাপদ নয়, ভিনদেশি অন্ধকারের কৃমিদের কাছে। আহত হওয়ার পর বিষক্রিয়ায় কোন পর্যায়ে তিনি ছিলেন তা আমাদের দ্বারা অনুমান করাও দুঃসাধ্য। তিনি ছিলেন মূলত হেমলক পান করার পর সক্রাতেস যে-অবস্থায় ধীরে ধীরে মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করে চলেছিলেন সেই অবস্থায়। তবু তাঁর জার্মানিতে যাওয়াটা বেঁচে থাকার এক ধরনের তৃষ্ণা বলা যায়। শেষপর্যন্ত পান করা হেমলকের অনন্ত বিষাদের আরকক্রিয়া থেকে নিস্তার মেলেনি তাঁর। তিনি ঢলে পড়লেন। তাঁকে আমরা নিহত হওয়া বলতে পারি। বলতে পারি আত্মহত্যাও। তাঁকে আমরা বাঁচাতে পারিনি। এই দায়ভার আমাদের সবাইকে বহন করতে হবে। যারা তাঁকে খুন করতে চেয়েছিল আর আমরা যারা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছি, তারা সমান অপরাধী।
হুমায়ুন আজাদ নেই; আমরা যারা আছি, এটুকু আশা নিয়ে আছি : তাঁর মৃত্যু এক ধরনের পুনর্জন্মের গান। তিনি উদাহরণ হয়ে আছেন নির্ভীক শহিদের, আত্মত্যাগকারী, মৃত্যুকে মহিমা দানকারী, প্রতিবাদী এক মহাপুরুষ হিসেবে।

ফ্রাঁসোয়া মোরিয়াকের পাপ বিশ্ব

আমি একজন মেটাফিজিশিয়ান। মূর্তের ওপর কাজ করি। পাপময় ক্যাথলিক বিশ্বকে দৃশ্যগোচর, স্পর্শগ্রাহ্য আর গন্ধবহ রূপ দিতে চাই। ধর্মশাস্ত্রবেত্তারা পাপী সম্বন্ধে আমাদের বিমূর্ত ধারণা দেন মাত্র। আমার কাজ তার সঙ্গে রক্তমাংস লাগানো।
উপরোক্ত কথাগুলো পারী রিভিউ পত্রিকার সাথে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বয়ান করেন। এই হচ্ছেন মোরিয়াক। গড়পড়তা ফরাসি ঔপন্যাসিকদের থেকে একেবারেই আলাদা। নিজেকে একজন ক্যাথলিক হিসাবে সবসময় দাবি করেন। সবাই তা জানে। কিন্তু তাঁর উপন্যাস যে-কোনো আধুনিকের চাইতেও আধুনিক। একটা সময় তিনি লেখা শুরু করবার আগে নাকি ঘণ্টাখানেক বাইবেল পড়তেন, তিনি ভাবতেন এতে গদ্য ভাল হবে। কিন্তু পরে তিনি মত বদলান যে বাইবেলের গদ্য সবধরনের লেখার জন্য উপযুক্ত নয়। তাঁর যে বইটি নিয়ে আলোচনা করতে চাই সেটার নাম “ডেজার্ট অব লাভ” (Le Désert de l’amour)। ফরাসি থেকে এটি ইংরেজী অনুবাদ করেন জন মরিস । প্রকাশক ম্যাকমিলান।
পিতাপুত্র একই নারীর প্রেমে পড়েছে। এরকম সফল উপন্যাস খুব বেশি নাই বিশ্ব সাহিত্যে। ফরাসি উপন্যাসিক ফ্রাঁসোয়া মোরিয়াকের এই উপন্যাসটি এই ধরনের একটি সফল উপন্যাস বলা যায়। এ উপন্যাসে নায়িকা মারিয়া ক্রস মসিয়ে ভিক্তর লারুসেলের রক্ষিতা। তার ছেলের অসুখ হলে ডাক পড়ে শহরের জাদরেল ডাক্তার মঁসিয়ে কোরেজের। ছেলেটাকে অবশ্য শেষ পর্যন্ত বাঁচাতে পারেনা ডাক্তার। ফলে মাঝে মাঝে মারিয়াকে দেখতে আসতেন ডাক্তার। মারিয়া ছিল অদ্ভুত রূপসী আর সাক্ষাত প্রেম দেবী যেন। ধীরে ধীরে কোরেজ প্রেমে পড়ে মারিয়ার। মারিয়ার দিক দিয়ে অবশ্য ব্যাপারটা অন্য রকম। ডাক্তার আসলে সমাজে তার সম্মান বাড়ে এই তার পাওয়া। এমনিতে সে মনে মনে বিরক্ত হয়। কেননা ততদিনে স্পস্ট হয়ে যায় কেন ডাক্তার ঘনঘন তার কাছে আসে। ইতিমধ্যে মারিয়ার সাথে পরিচয় হয় ডাক্তারের ছেলে রেমন্ডের ঘটনা মোড় নেয় অন্য দিকে। রেমন্ড স্কুলের ছাত্র। টগবগে রক্ত। একদিন মারিয়াকে বিছানায় টানলে তাকে বাড়ী থেকে বের করে দেয় মারিয়া। রেমন্ডের জীবনে এটা ছিল প্রথম ব্যর্থতা কোনো নারীর কাছে। রেমন্ড বুঝতে পারে তার পিতা কেন এত অসুখি। রেমন্ড বোর্দো ছেড়ে পাড়ি জমায় পারিতে। এদিকে লারুসেল মারিয়া ক্রসকে বিয়ে করে পারিতে নিয়ে যায়। লারুসেল অসুস্থ হয়ে পড়লে মারিয়া চিঠি লিখে ডাক্তারকে নিয়ে যায় পারিতে। এক অদ্ভুত সম্মোহনী শক্তি আছে এ উপন্যাসে। শেষে ডাক্তার এবং রেমন্ড দুজনই বুঝতে পারে না পাওয়াটাই প্রেম। মোটামুটি এই হচ্ছে বইটার কাহিনী।
মহান উপন্যাসিক নিজে ছাড়া অন্য কারো ওপর নির্ভর করেন না। প্রুস্তের সংগে তার কোনো পূবর্সুরীর মিল নাই হয়তো উত্তরাধিকারীরও নাই। মহান উপন্যাসিক নিজস্ব ছাঁচ ভেংগে নেন, তিনিই তার একক ব্যবহারকারী। বালজাক বালজাকীয় উপন্যাসের স্রষ্টা, তার রচনাশৈলী কেবল বালজাকেরই উপযুক্ত। ধার করা রচনা শৈলী বাজে। নিজেদের বক্তব্য পেশ করার জন্য ফকনার থেকে হেমিংওয়ে পযর্ন্ত সব মার্কিন লেখক নিজস্ব শৈলীর ওপর নির্ভর করেছেন।
উপরোক্ত কথাগুলো তিনি বলেন এক সাক্ষাতকারে। কথাগুলো মোরিয়াকের নিজের সম্পর্কেও সত্য। মোরিয়াক ১৮৮৫ সালে বর্দোর এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মান। ১৯৫২ সালে তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়।

বিষয়: আনাতোল ফ্রাঁস ও সিলভেস্তা বোনার্ডের অপরাধ

আনাতোল ফ্রাঁসের মৃত্যুর কিছুদিন আগে শিকাগো টাইমস পাঠকদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ লেখকদের সম্পর্কে তাঁদের মতামত দিতে। ফলাফলে দেখা যায় ১. শেক্সপীয়র ২. গ্যোতে ৩. আনাতোল ফ্রাঁস। আনাতোল ফ্রাঁস অসাধারন হিউমার সমৃদ্ধ ফরাসী লেখক। আমাদের দেশে তিনি কামু অথবা সাত্রের মত পরিচিত নন। ১৮৪৪ সালের ১৬ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন তিনি। সাহিত্যে বিশেষ করে উপন্যাসে দুই ধরনের স্কুল দেখা যায়। লিটারারি জারনালিজম আর লিটারারি মনাস্টিসিজম। তিনি এই শেষোক্ত স্কুলের লেখক। তিনি নিজেও বলতেন তিনি সমকালীনদের লেখা পড়তেন না সবসময় ক্লাসিকের দিকেই ছিল তার ঝোক। তাঁর লেখা সব বই প্রকাশের সাথে সাথেই ক্লাসিকের স্বীকৃতি পেয়েছে। আনাতোল ফ্রাঁসের আসল নাম Jacques Anatole Thibault. তিনি ঠাট্টার ছলে বলতেন আহা মূল নামটার উচ্চারণই ভুলে গেছি। ফ্রাঁস জন্মেছিলেন এক বইয়ের দোকানদারের ঘরে। সেকেন্ডারী স্কুলে পড়াকালীন সময় থেকেই তিনি বইয়ের পোকা। পিতামাতা চেয়েছিলেন পাদ্রী হবেন কিন্তু ফ্রাঁস তার বিরুদ্ধে। যুদ্ধ ক্ষেত্রে ঈনিড পড়তে গিয়ে সামান্যর জন্য বেঁচে যান বোমার আঘাত থেকে। অন্য কোনো কাজেই মন ছিলনা তার। ১৮৭৬ সালে সেনেট লাইব্রেরীতে একটা চাকরি পান। কাজ না করে বই পড়ার অপরাধে সেটাও হারালেন। পরের বছর বিয়ে করেন তার চাইতে বড়লোকের মেয়ে ভালেরি গুয়েরিনকে। বছর দেড়েক সংসার করলেন। মাদাম বুঝলেন স্বামী বস্তুটির মূলত কোনদিকে মনটন নাই কেবল ঐ বই পড়া ছাড়া। তিনি আবার খুব ব্যবসা বুদ্ধি রাখেন। ফলে গন্ডগোল আর বিচ্ছেদ। ফ্রাঁসের জীবনে মাদাম অরমানি দি কেলাভেত ছিলেন সৌভাগ্যের প্রতীক স্বরূপ। ফ্রাঁসের লেখক হয়ে উঠার পেছনে এই ভদ্রমহিলার অবদান স্বীকৃত। ফ্রাঁস আলসেমি করে লেখাটেকা শিকেয় তুলে রাখলে মহিলা বুঝিয়ে তাকে লেখার টেবিলে বসাতেন। মতবাদের দিক থেকে ফ্রাঁস সমাজতন্ত্রী থাকলেও রাজনীতি বিষয়ে চুপচাপ ছিলেন। ব্যঙ্গ, রসবোধ, গভীর বেদনা আর প্রজ্ঞা এই ছিল তার লেখার চরিত্র। আনাতোল ফ্রাঁসের আত্মজীবনী অন লাইফ এন্ড লিটারেচারে তিনি লেখেন বিশ্বাস করুন, আমি মনে করি লেখার চাইতে বাধাকপির চাষ করা ভাল। আর সত্যি যদি লিখতে চান তবে সমসাময়ীকদের লেখা পড়া ঠিক হবেনা। বলা ভাল এই মন্তব্যটি মারাত্মক কিন্তু সত্য। সমসাময়ীকদের লেখা বেশী পড়লে নিজের লেখার মান নেমে যেতে পারে। আজেবাজে লেখাও প্রচারগুণে মহান সাহিত্য হয়ে যায় আজকাল।
আরেক জায়গায় তিনি লেখেন সৌন্দয্যই শক্তি। তাকে ছেড়ে কোথায় যাবে? নারী ফুল নদী জ্যোৎস্না ছেড়ে। যদি আমাকে সুন্দর আর সত্যের মধ্যে একটাকে বেছে নিতে বলা হয় তাহলে আমি সুন্দরকেই বেছে নেব কারণ সুন্দরই একমাত্র সত্য। আরেক জায়গায় লেখেন ইন্দ্রিয় চেতনা শিল্প চেতনার ভিত্তি। মহত শিল্পীদের প্রতিভার চার ভাগের তিন ভাগই ইন্দ্রিয় চেতনা। অনেকে বলে ইন্দ্রিয় চেতনা পাপ-কেন? ভার্জিন মেরী যিনি পাপ ছাড়াই জননী হয়েছিলেন। তবে দয়া করে আমাকে পিতৃত্ব ছাড়াই পাপ করতে দিন। এই রকম অনেক রসময় বাক্যে ভরপুর তার বইটি। তাঁর এ উপন্যাসটি আত্মজীবনীমুলক। মঁসিয়ে বোনার্ড অদ্ভুত রকমের একজন মানুষ। যিনি বইপত্র আর পুরানো পান্ডুলিপি সংগ্রহ করে জীবন কাটান। তাঁর সংসার বলতে ঝি তেরেজা আর প্রিয় বিড়াল হামিলকার। একদিন মঁসিয়ে কোকোজ নামের একজন পান্ডুলিপি বিক্রেতা আসেন। তিনি কিছু আজেবাজে পান্ডুলিপি গছাতে চান বোনার্ডকে। বোনার্ড নেন না তবে লোকটার জন্য দু:খ পান। তেরেজাকে জিজ্ঞেস করেন কোথায় থাকে এই লোক জান? তেরেজা বলে এই দালানের চিলেকোঠায়। বৌটার বাচ্চা হবে। আরও একটা শিশুকে এই পৃথিবীতে আনার জন্য লোকটাকে গালিগালাজ করতে করতে বোনার্ড উপরে কিছু খাবার দাবার পাঠিয়ে দেন। বোনার্ড তাঁর পুরনো পান্ডুলিপির তালিকা খুঁজতে খুঁজতে চর্তুদশ শতকের জ্যাক দ্য ভোরাজিনার-সন্ন্যাসীদের কাহিনীর সন্ধান পান। বইটির নাম গোল্ডেন লেজেন্ড। পান্ডুলিপিটা পাওয়ার জন্য তিনি পাগল হয়ে উঠলেন প্রায়। আট ন মাস পরে বোনার্ড যখন একটা পুরানো ভাস্কর্য ও বইয়ের দোকানে গেলেন তখন মাদাম কোকোজের সাথে তাঁর দেখা হয়। ততদিনে মঁসিয়ে কোকোজ মারা গেছেন। সেই গোল্ডেন লেজেন্ডের জন্য চিঠি লিখতে লিখতে একসময় বোনার্ড একটা চিঠি পান। নেপলস থেকে পান্ডুলিপির মালিক জানাচ্ছেন। ওটা আছে, তবে তিনি হাতছাড়া করবেন না। দেখতে অথবা কাজ করতে হলে ওখানে গিয়েই করতে হবে। ইতি এম এ পলিজি। মদ্য ব্যবসায়ী । সিসিলি। অতএব সিসিলি যেতেই হয়। কিন্তু তেরেজা রাজী না হলে? তেরেজা রাজি তবে সন্ধ্যা ছটার মধ্যে ফেরা চাই। কারণ আজ একটা বিশেষ খাবার সে বানাচ্ছে মঁসিয়ের জন্য। বেচারি জানে না সিসিলি কোথায়! কী করে যে জিনিসপত্র নিয়ে বোনার্ড সিসিলি গিয়ে পৌছান ভগবান মালুম। রেস্তেরাঁয় খেতে গিয়ে এক দম্পতির সাথে তাঁর পরিচয়। দিমিত্রি এবং মাদাম ত্রেপফ। রুশ দম্পতি, তাঁদের শখ জগতের তাবত দেশলাই বাক্স সংগ্রহ করা। কথায় কথায় মঁসিয়ে বোনার্ডের পারির ঠিকানা শুনে মাদাম ত্রেপফ স্তব্ধ হয়ে যান। কারন ইনিই হচ্ছেন সাবেক মাদাম কোকোজ। মাদাম কোকোজ বোনার্ডের বদান্যতার কথা ভুলেননি। এরপর পান্ডুলিপির মালিকের কাছে গিয়ে বোনার্ডের মাথা খারাপ হয়ে যাবার যোগাড়, তিনি জানলেন পান্ডুলিপি ইতোমধ্যে পারিতে চলে গেছে। তিনি আবার পারি ফিরে আসেন। বোনার্ড নিলামখানায় এসে তাঁর সর্বস্ব বাজি রেখে নিলাম ডাকেন। কিন্তু পান্ডুলিপির মালিক নিজেই কার জন্য যেন সর্বোচ্চ নিলামে ডেকে নিলেন। বোনার্ড জানতে চান কে এই লোক। মালিক জানালেন নাম বলা বারণ। কিছুদিন পর বোনার্ডের জন্মদিনে তেরেজাকে একটা বাক্স নিয়ে ঢুকতে দেখে বোনার্ড জিজ্ঞেস করেন কি আছে ওখানে। বোনার্ড খুলে অবাক। একগাদা ফুলের মধ্যে সেই পান্ডুলিপিটা। এইভাবে কাহিনীটা এগোতে থাকে। ফ্রাঁস জীবিত থাকাকালীনই এই বইটা ক্লাসিক হিসাবে সম্মান লাভ করে। পরের ঘটনা আরো মর্মস্পর্শী। বোনার্ড এক বাড়ীতে বইয়ের ক্যাটালগ তৈরী করতে এসে একটি ভারী সুন্দর খুকীকে দেখে তাঁর ভেতর পিতৃস্নেহের হাহাকার টের পান। আহা ক্লেমেনতীন এতদিন তাঁর জীবনে থাকলে তাঁরও এতসুন্দর একটা মেয়ে থাকতে পারতো। পরে তিনি জানতে পান এ আসলে ক্লেমেনতীনেরই মেয়ে, দেখতে অবিকল তার মত। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন মেয়েটার এখন কেউ নেই। তিনি স্কুলে আইনগত ভাবে মেয়েটার ভার নেন। বোর্ডিং স্কুলের এক শিক্ষিকা বোনার্ডের প্রেমে পড়েন। কিন্তু বোনার্ড তাঁকে প্রত্যাখান করলেন। শিক্ষিকা ছোট্ট মেয়েটির উপর নির্যাতন বাড়িয়ে দেন। একদিন বোনার্ড স্কুল থেকে জেনকে নিয়ে আসেন। জেন বড় হয়। বোনার্ডের এক ছাত্রকে ভালবাসে জেন। ছাত্রটি আবার যৌতুক নেবেনা। বিয়ের দিন শোকে উদ্বেলিত বোনার্ড। কি দেবেন নিজের মেয়েকে। কি আছে তাঁর এই বিশাল বই আর পান্ডুলিপির ভুবন ছাড়া। সমগ্র জীবনের সঞ্চয়ের বিনিময়ে যা গড়ে তুলেছেন। বোনার্ড সিদ্ধান্ত নিলেন এই লাইব্রেরীটাই পুরো বিক্রি করে যা পাবেন তা তুলে দেবেন জেন আর তার বরের হাতে। কারণ ততদিনে অকৃতদার বোনার্ড বুঝে গেছেন পিতৃস্নেহের কাছে তাঁর সমগ্র জীবনের অর্জন অতি তুচ্ছ। অসাধারণ এই বইটি আপনাদেরও ভাল লাগবে আশা করি।

নুট হামসুন ও ‘গ্রোথ অব দি সয়েল’ প্রসঙ্গে

পৃথিবীতে যে-ক’জন লেখক একেবারে মাটির কাছাকাছি, তাঁদের মধ্যে নুট হামসুন অন্যতম। নুট হামসুনের এই উপন্যাসটি মহাকাব্যের লক্ষণাক্রান্ত। পড়তে পড়তে অবশ হয়ে যেতে হয়। নরওয়ের বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলের বর্ণনা পড়তে পড়তে প্রকৃতির ভেতর ডুবে যেতে হয়। এ-উপন্যাসের নায়ক আইজাক যেন আদম। এই বনাঞ্চলে সে-ই যেন প্রথম মানবসন্তান। এই অবারিত প্রকৃতির ভেতর সে গড়ে তুলতে চায় তার বাসস্থান। এই অনাবাদী জমিতে সত্যি সত্যি সে একটা ঘর বানায়। বাস করতে থাকে। ফসল হতে থাকে তার মাঠে। আর একদিন সে নিঃসঙ্গ হতে থাকে। তার ক্ষুধা এক নারীর । পথ দিয়ে যাবার সময় দু’-এক জনকে বলেছেও তার জন্য যেন একটা মেয়ে দেখে তারা। খুব সুখের জীবন তার। একদিন অপরাহ্ণে হাজির হয় এক আগন্তুক নারী। নাম তার ইঙ্গার। প্রথম দিকে বোঝা যায় না । পরে বোঝা যায় তার উপরের ঠোঁট চেরা। এ-কারণে তাকে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে জীবনে। ঠোঁট চেরার কারণে তার বিয়ে হয়নি এতদিন। রাতে তাকে গ্রহণ করে আইজাক। এভাবে তারা বাধা পড়ে যৌথজীবনে। ইঙ্গার কর্মঠ নারী। তারা গড়ে তোলে খামার। গরু-ছাগল নিয়ে একটা ভরান্ত পরিবার। আবাদী জায়গাটার একটা নামও দিয়ে দেয় তারা : সেলেনারা। তাদের কোল জুড়ে আসে ইলিসিমা আর সিভার্ট। আইজাক আর ইঙ্গার এখন দুই পুত্রসন্তানের জনকজননী।
তৃতীয় সন্তান পেটে । ইঙ্গারের একটাই ভয় — তার উপরের ঠোঁট চেরা। এখন ছেলে-মেয়ে হলে যদি তারও ঠোঁট চেরা হয়? ইঙ্গার নিজের জীবন দিয়ে বুঝেছে অঙ্গহীন জীবনের দুঃখযন্ত্রণা। এজন্য তার বিয়ে হয়নি। কাউকে ভালোবাসার সাহস হয়নি তার — যদি তার প্রেমিক তাকে ঘৃণা করে? তৃতীয়বারের মতো তার একটা মেয়ে হয় এবং তার উপরের ঠোঁট চেরা। প্রতিবেশীরা এল দেখতে। কী লজ্জা! সকলে চলে যেতে ইঙ্গার একটা ভীষণ কাণ্ড করে বসল। সে যেমন সারা জীবন ধরে উপহাস আর যন্ত্রণা পেয়েছে, তার মেয়ে যেন তা না পায়। মেয়েটাকে গলা টিপে হত্যা করে বনের ধারে পুঁতে রেখে আসে। এক নিষ্পাপ শিশুর নির্জন কবর। ওদিকে আইজাক ব্যস্ত থাকে খুব কাজে-কর্মে। কিন্ত এক প্রতিবেশিনী কবর থেকে মেয়েটার লাশ নিয়ে সদরে ইঙ্গারের বিরুদ্ধে মামলা টুকে দেয়। এতে আট বছরের সাজা হয়ে যায় ইঙ্গারের।
এভাবেই এগোতে থাকে এ-উপন্যাসের কাহিনী। শেষে জেলে ইঙ্গারের আরেকটা মেয়ে হয়। তারও ঠোঁট চেরা। কিন্ত এবারে ডাক্তার অপারেশন করে তার ঠোঁট ঠিক করে দেয়। এরপর আইজাকের জমিতে তামার খনি পাওয়া যায়। আইজাক জমি বিক্রি করে দেয়। এতে তার প্রচুর লাভ হয়। শেষে ইলিসিমা শহরে চলে যায়। সে সেখান থেকে আমেরিকা পাড়ি জমায়। আর সেভার্ট বাবার মতো চাষবাস করে থেকে যায় গ্রামে। কী আশ্চর্য সুন্দর এই সেলেনারা! এখানে আকাশ আর মৃত্তিকা অবারিত। সেভার্ট ভালোবেসে ফেলে এই অঞ্চলকে। কেবল চাষবাসে নয়, নগর সভ্যতারও বিকাশ ঘটেছে এ-এলাকায়। তামার খনি আবিষ্কারের সাথে সাথে আধুনিক বিজ্ঞান যে-বলিষ্ঠ পদক্ষেপ রাখছে, তাকেও অস্বীকার করার উপায় নাই। সভ্যতা যতই এগিয়ে আসুক, মানুষকে তো তবুও নতুন আবাদ করতে হয়। সমস্ত উপন্যাসে একটা অদ্ভুত মহাকাব্যিক আবহ ধরে রাখে পাঠককে।
নুট হামসুন ১৮৫৯ সালে ৪ আগস্ট অত্যন্ত দরিদ্র এক কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। খুব কম বয়সে বাবা মারা যান। পরিবারে লেখাপড়ার তেমন কোনো চল ছিল না। হামসুন স্কুলশিক্ষাও তেমন কিছু পাননি। চাষ ছাড়াও আরেকটা কাজ তিনি শিখেছিলেন : জুতা তৈরি। যে-ওস্তাদের কাছে হামসুন কাজ শিখতেন, তাঁর কাছে অনেক বড় বড় লোক আসতেন। তাঁদের দেখে দেখে হামসুন অনেক বড় হবার স্বপ্ন দেখেন। তিনি বুঝলেন, বড় হতে হলে লেখাপড়া দরকার। হামসুন স্কুলের কিছু পাঠ্যসূচি জোগাড় করে পড়তে লাগলেন। হামসুন বুদ্ধিমান ও পরিশ্রমী ছিলেন। তিন বছরের কোর্স এক বছরে শেষ করলেন। একটা কেরানির চাকরিও জুটে যায়। পোষাল না, হলেন স্কুল মাস্টার। নিয়মিত পড়তে থাকেন। অবশ্য সাহিত্য। মাঝে মাঝে কবিতা লেখেন, পত্রিকায় পাঠান। দু’-একটা ছাপাও হয়। ইচ্ছে হল লেখক হবেন। ক্রিশ্চিনা শহরে এসে চেষ্টা করতে থাকেন। বহু কষ্টে জীবন ধারণ করেন। চলে গেলেন আমেরিকা। সেখানে বাগানের মজুর, মাছ ধরার জেলে, গমক্ষেতে, রাস্তা মেরামতের কুলি, কয়লা ভাঙার মজুর, ট্রামের কন্ট্রাকটরি ইত্যাদি কাজ করতে লাগলেন। কিন্ত সময় পেলেই বই খুলে বসেন। একদিন এমনি কাজের ফাঁকে গ্রিক নাটক পড়ছিলেন। কাজ ফাঁকি দেবার অভিযোগে চাকরি খতম।
আবার শুরু হল ক্ষুধার সাথে সংগ্রাম। অনাহার আর অর্ধাহার। একদিন না কি কুকুরের নাম করে কসাইয়ের কাছ থেকে একটা হাড় চেয়ে নেন। তাতে একটু মাংস লেগে আছে কি না। হাড়টা নিয়ে একটা গলিতে ঢুকে পড়েন। কামড় লাগান — উফ, কী বিচ্ছিরি গন্ধ! তাও সহি। এই হচ্ছেন নুট হামসুন। এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগান তিনি, লেখেন তাঁর সবচাইতে বিখ্যাত উপন্যাস হাঙ্গার। এই বই লিখতে গিয়ে না খেয়ে হামসুন একেবারে শুকিয়ে কাঠি। জরাজীর্ণ পোশাক। হামসুন পান্ণ্ডুলিপিটা নিয়ে পলিটিক্যাল পত্রিকার নামজাদা সম্পাদক এডওয়ার্ড ব্রাওসের সঙ্গে দেখা করেন। অভিজাত ও ঐশ্বর্যের গর্বে গর্বিত এই লোক। হামসুনের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকান। সরাসরি অবশ্য বিদায় করলেন না। পাণ্ডুলিপিটা দয়া করে রাখলেন। তারপরে পড়ে অবাক। হাঙ্গার প্রকাশিত হতে থাকল। মাটির কাছাকাছি থাকা কবির প্রথম জয়যাত্রা শুরু।
নুট হামসুন নোবেল পুরস্কার লাভ করেন ১৯২০ সালে। অনেক সমালোচকই তাঁর নাজি কানেকশন নিয়ে তাঁর উপর ক্ষ্যাপা, তবে সেটা আলাদা অধ্যায়। ১৯৫২ সালে এই মহান লেখক দেহত্যাগ করেন।

মারগুরিত দ্যুরাজ সর্ম্পকে প্রাসঙ্গিক

ফরাসি নিউ ওয়েভ চলচ্চিত্র গোষ্ঠীর অন্যতম মেধাবী চলচ্চিত্রকার আলা রেনের ‘হিরোশিমা মন আমুর’ মুভিটা দেখে জন্মানো আগ্রহ থেকে প্রথম জানতে পারি মারগুরিত দ্যুরাজ সর্ম্পকে। দ্যুরাজ ছবিটার লেখক ছিলেন। ছবিটার লেখক হিসেবে কানে ও বার্লিনে তিনি যথেষ্ট সম্মানও পেয়েছেন। পরে তিনি নিজেও বেশকটি ছবির পরিচালনা করেছেন। যদিও তাঁর পরিচালিত কোনো ছবি দেখার এখনব্দি সৌভাগ্য হয় নাই। L’Amant ( লাঁম বা প্রেমিক) তার আত্মজীবনী মুলক এই ফিকশনটার গোপনে গোপনে প্রতীক্ষায় ছিলাম বলা চলে। বইটির খোঁজ কারো কাছে পাই নাই। জানতামও না কলকাতার এবং মুশায়েরা থেকে বইটার অনুবাদ বেরিয়ে গেছে। যাইহোক নারায়ণ মুখোপাধ্যায়ের মুল ফরাসী থেকে অনুদিত এই ছোট বইটি শাহবাগে পেয়ে গেলাম। দ্যুরাজের  প্রতি দুর্দান্ত টানের কারণে বইটা কিনলেও পাতা উল্টিয়ে দেখা গেল প্রথম পৃষ্ঠাটা টানছেনা। যে বই প্রথমেই তার সঙ্গী করেনা তার কাছে ফিরে আসতে সময় লাগে। কেননা একসাথে বেশকটি বই পড়ার লিস্টে থাকে।
লামঁ-মারগুরিত দ্যুরাসের এই বইটি কেনার পর তিন তিনবার ব্যর্থ হয়ে ভেবেছি টাকাটা জলে গেল নাতো। বইটা এতো সুন্দর ছোট মনে হয় সব কাজকামের আগে এইটা শেষ করে নেই। কিন্তু তিন তিনবার ব্যর্থ হবার পর দেখা গেল ইতোমধ্যে বাকী বইগুলো খতম। পয়সা হাসিল করার মানসিকতা নিয়ে আবার পড়তে থাকি।
এবার  মারগুরিতের ভাষায় বলতে হয় এযে নিরাকার সমুদ্র।
সেটা ছিল ফরাসিদের উপনিবেশ বিস্তারের সময়কাল। ইন্দোচীন তথা বর্তমানের ভিয়েতনাম এ নভেলের পটভূমি। উপনিবেশ শেষ হয়ে যাবার পরও বিভিন্ন সমস্যায় আটকে থাকা একটি পরিবার। দায় দেনায় জর্জরিত। মাষ্টারনি গৃহকর্ত্রী যার স্বামী সদ্যগত। দুই ছেলে এক মেয়ে। বড় ছেলেটি মায়ের প্রশ্রয়ে নস্ট, যে নিজের ভাইবোনের কাছে সবসময় অত্যাচারী সম্রাট। আর পনের বছরের তুলতুলে মিষ্টি মেয়েটি যে কিনা বেরিয়ে পড়তে চাইল এই অসহ্য এক ঋতুর গ্রীষ্মের দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও অথবা ফ্রান্সের দিকে। মা তাকে জিজ্ঞেস করে কি তুমি করতে পারো? আর সে বলে।
তাকে আমি বলেছিলাম যে লিখতে চাই। যা কিছু চাই তার মধ্যে সব চাইতে বেশী চাই লেখক হতে আর কিছু হতে চাইনা।
তার সহ্য হলোনা। একনজর থাকিয়ে চোখ ঘুরিয়ে নিল। কাধের একটা ছোট্ট ঝাঁকুনি। ভোলা যায়না। আমিই প্রথমে চলে গেলাম। আমাকে খোয়াবার আগে আমার মাকে আরও বছর খানেক অপেক্ষা করতে হয়েছিল। আমাকে খোয়াবার জন্য এই বাচ্চাটাকে হারাবার আগে। ছেলেদের জন্য তার ভয় ছিল না। কিন্তু এটা সে জানত চলে যাবে, এ বেরিয়ে যেতে পারবে। ক্লাসে ফরাসিতে ফার্স্ট। মাস্টার মশাই মাকে বলেছিলেন-ক্লাসে আপনার মেয়ে ফরাসিতে সবচাইতে সেরা। আমার মা কিছু বলল না। কিছু না। মোটেই খুশি নয় সে কারন তার তার ছেলেরা ফরাসিতে প্রথম হয়না। নোংরা আর মিষ্টি মা আমার জিজ্ঞাসা করল, আর অংকে? উত্তর হল- এখনও নয় তবে হবে। মা জিজ্ঞাসা করল: কবে হবে?
উত্তর হল- ও যখন চাইবে।
কিন্তু না সে অংকে সেরা হতে চায়নি। সে চেয়েছিল লিখতে, লেখক হতে। মা বলেছিল লেখাটা কোনো কাজই না। আর সে বেরিয়ে পড়েছিল বাড়ী থেকে। এরপর মেকং নদী পার হবার বজরায় এক চিনের সাথে তার পরিচয় যে কিনা কিছু দিন আগে ফ্রান্স থেকে ফিরেছে। বজরা ডাঙ্গায় ভিড়লে সে বলেছিল আমার লিমুজিনে যাবে তোমাকে পৌঁছে দেব। মেয়েটি তাকে অনুসরণ করলো। এরপর তার সাথে জড়িয়ে পড়ে মেয়েটি। এরপর ক্রমে সে আসক্ত হয়ে পড়ে মাদকে আর সমকামিতায়। মোট কথা সমস্ত প্রথা ভেঙ্গে সে ক্রমে ব্যক্তি হয়ে ওঠে। মোট কথা ৬০ পৃষ্ঠার ছোট এ উপন্যাসটা উপন্যাসেরও সমস্ত ফর্ম ভাঙ্গার উপন্যাস হয়ে ওঠে। কিন্তু অদ্ভুত আন্তরিক আত্মা ও রক্ত দিয়ে লেখা। চৈতন্যকে এক জায়গায় ফিরিয়ে নিয়ে আসে।
ফরাসী লামঁ শব্দের অর্থ প্রেমিক। মারগুরিত জন্মেছিলেন ইন্দোচীনে ১৯১৪ সালে। মৃত্যু ১৯৯৬ সালে। এ বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮৪ সালে। এ উপন্যাস শুধু যে ফরাসি বিখ্যাত পুরস্কার গঁক্যুর বাগিয়ে নিল তা নয়। দ্যুরাসকে দিয়েছে ৩ মিলিয়ন বিক্রিত বইয়ের লেখিকার সম্মান। পৃথিবীর অন্তত ৪০ টি ভাষায় অনুদিত। জাঁ জাক আনো এটি চলচ্চিত্র রূপ দেন। বলা যায় এটি নিয়ে শুরু হয় ফরাসি সাহিত্যের NOUVEAU ROMAN বা নব-উপন্যাস আন্দোলন। পুরা উপন্যাসটায় কোনো ধারাবাহিকতা নাই। কিন্তু কেমন যেন গুছানো। বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার বহু বহু দিন পর চিনে লোকটি তার নববধূ সহ পারিতে এলে একদিন ফোন করে মেয়েটিকে বলে: আমি শুধু তোমার কন্ঠস্বর শুনতে চেয়েছিলাম। যদিও তাদের প্রেমটায় দেহ ছাড়া অন্য কিছু ছিলনা। অনেক পরে তারা বুঝতে পারে সে আসলে তারা পরস্পরের প্রেমে পড়েছিল। সার্ত্র আর মালার্মে সহ তৎকালীন পারির লেখকরা ওঠে আসে বিভিন্ন অধ্যায়ে।

ফের কাঁদিদ পড়ার আনন্দ অথবা বেদনা

এই বইটি প্রথম পড়ি ১০ বছর আগে, পাঠচক্রে। এটা ছিল বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত। অনুবাদকের নাম মনে নাই। অনেকটা দায়সারা গোছের মনে হয়েছিল অনুবাদটা। পাঠচক্রে বই থেকে ভাললাগা ক’এক লাইন টুকে আনতে হতো। তার পর সমন্বয়কারী দস্তখত দিতেন। আর কেউ একজন বইটার ওপর আলোচনা করত। তখন একটা শব্দই গেঁথে ছিল মনে এলদোরাদো (স্বর্ণভূমি)।বলা যায় এই স্প্যনিশ শব্দটার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু দশ বছর পর গতবাত্রে যে কাঁদিদ পড়লাম। এটা মূল ফরাসী থেকে অনুবাদ করেছেন ফরাসী ভাষাবিদ কবি অরুণ মিত্র। এ এক অসাধারণ অনুবাদ। একেবারে মূলের ছোয়া পাওয়া যায়। ভলতেয়ারকে চিরদিন গুরু মানি, কেননা তাঁর মতো প্রথাভাঙ্গা দার্শনিক ইহজন্মে আর দেখা দেয় নাই। সবকিছুতে তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম। রাজতন্ত্র বিরোধী, ধর্মবিরোধী, সবসময় হতাশাবাদী ইত্যাদি। নিজদেশে বুদ্ধি হবার পর থেকে থাকতে পারেননি। সবসময় ক্ষমতাবানদের বিরোধিতা করেছেন। নির্বাসন আর জেল ছিল তাঁর জীবন। তিনি বলতেন দূর্ণীতিপরায়ন রাস্ট্রে সৎ মানুষের একমাত্র বাসস্থান কারাগার।
এই বইটিতে তিনি মূলত অষ্টাদশ শতাব্দীর পুরো ইউরোপকে পটভূমি ও বিষয়বস্তু করেছেন। যদিও এটাকে ফিকশন বলা হয়, মূলত মানুষের বোধ্য করে তিনি দর্শন লিখেছেন বলে মনে হয়ে আমার। পৃথিবীর যে সব আশাবাদী দার্শনিক সক্রাতেস, এরিস্তোতল আর ধর্মগ্রন্থসমূহ এমনকি ভারতীয় গীতা উপনিষদেও যে সবকিছু সবসময় সবচেয়ে ভালর জন্য ঘটে। পুরো উপন্যাসটি তিনি এই বাক্যের বিরোধিতা করার জন্য লিখেছেন। এর নায়ক কাঁদিদকে শিখিয়েছিল তার দর্শনগুরু প্লাঁগস। ব্যারণ কন্যাকে চুমু খাওয়ার অপরাধে রাজদরবার থেকে পাছায় ১৪টি লাথি দিয়ে কাঁদিদকে বের করে দেবার পর। সে বেরিয়ে পড়ে পৃথিবীর পথে। ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশে কাঁদিদের নিয়তি তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। কিন্তু সবখানেই সে দেখল জানোয়ার সুলভমানুষ হিংস্রতা, প্রতারণা নিষ্ঠুরতা দখলদারিত্ব নারীধর্ষন খুন যুদ্ধ। এই সব পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে সে জানতে পারে পৃথিবীতে সব কিছু ঘটে সবচাইতে খারাপ হবার জন্য। মানবজাতির ভবিষ্যত সম্পর্কে বিরাট হতাশার ভেতর নিক্ষেপ করেন ভলতেয়ার পাঠককে। জেস্যুটদের ভন্ডামী, তথাকথিত আত্মহীন সাহিত্যিকদের ছলনা, দার্শনিকদের ভ্রান্তদর্শন সব নিজের মতো প্রায় অকাট্য যুক্তি দিয়ে সে পরাজিত করে।
কাঁদিদকে জিজ্ঞেস করে তার ভৃত্য_ তাহলে আশাবাদ মানে কি?
_কাঁদিদের উত্তর, সবকিছু খারাপ থাকা অবস্থায় যে বলে সবকিছু ভাল চলছে সে হলো গিয়ে আশাবাদী।
কত সত্য কথা আমাদের দেশের সরকারগুলোর দিকে থাকালে বুঝা যায়। দেশের চরম দুর্দিন বাজারে আগুন-কোনো সমস্যা নাই। বিদ্যুৎ নাই, সন্ত্রাস অবিচার রাস্তাঘাট নাই মানুষের খাদ্য নাই চিকিৎসা নাই সে অবস্থাতেই টিভিতে ঘোষনা করা হয় উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে চলেছে দেশ। ভেসে যে কোথায় যায় তাতো দেখছি নিয়ত। এর মধ্যে সত্যি এতো দর্শনের কচকচানি থাকলেও পড়তে অসাধারণ লাগে। যুবতী কুনিগাঁদের সাথে কাঁদিদের প্রেম। কুনিগাঁদকে অনুসরণ করে কাঁদিদের সমস্ত পৃথিবী ভ্রমণ।
তবে ভলতেয়ার আমাদের সমাধান দেয় এলদোরাদো। যেখানে পথের ধুলো হচ্ছে সোনা আর হীরা। এগুলো ছুঁয়ে দেখেনা এলদোরাদোর লোকজন। ও দেশে খেতে কোনো টাকা লাগেনা। মোটকথা আত্মিক শুদ্ধিময় এক কাল্পনিক রাজ্য এই এলদোরাদো। মঁসিয়ে ভলতেয়ার আজো মানবজাতি কোনো এলদোরাদো খুঁজে পায়নি এবং পৃথিবী সেই একই জায়গায় আছে। তেলের জন্য আমেরিকা এখনো ধ্বংস করে আফগান, ইরাক। হীরা সোনার জন্য লাতিন আমেরিকাকে নরক বানিয়ে রেখেছে সাম্রাজ্যবাদিরা। এই ছোট বইটা এখনো কত সত্য আর জীবন্ত আমাদের জন্য।

কবি ও কবিতা প্রসঙ্গে

খুব ভালো একজন কবিও কবিতা সম্পর্কে লিখতে গেলে উল্টাপাল্টা লিখতে পারেন। তার লেখায় ফুটে উঠতে পারে বিব্রতবোধ, বিনয় কিংবা নিজেকে লুকানোর চাতুর্য। উপায় নাই, কবিতা কি? এটা খুব সহজ প্রশ্ন নয়। অন্তত একজন কবির পক্ষে। এই একটি মাত্র প্রশ্ন ব্যক্তিভেদে একেক রকম হয়ে যায়। কেননা সব ব্যক্তি যারা কবিতা লেখে সবার অনুভবের ঐক্য এক রকম নয়। পাবলো নেরুদা বলেছিলেন, কোনো কবিকে এ ধরনের প্রশ্ন করা অনেকটা কোনো মহিলাকে তার বয়স জিজ্ঞেস করার মত।
কবিরাওতো সামাজিক জীব। সাধারণের সাথে তারাও একই সমাজে বাস করে। একই রাষ্ট্রের উৎপাদিত শষ্যাদি খেয়ে তারা জীবন বাচায়। সাধারণের সাথে একই স্কুলে কলেজে তারাও লেখাপড়া চালিয়ে যায়। কিন্তু এদের মধ্যে কারো ওপর ভর করে কবিতার আছর। যদিও রূপকার্থে অনেক সুন্দর সুন্দর বাক্য তৈরি করা যায়। কিন্তু এটার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার দিকে নজর দেয়া যাক। জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল সাগানের মতে মানব মস্তিষ্কের প্রধানতম কর্টেক্স সমূহ হচ্ছে সেরিব্রাল কর্টেক্স এবং আর কমপ্লেক্স।
ডারউইনের ন্যাচারাল সিলেকশনের পথে যে যোগ্যতার প্রশ্ন দেখা দেয় সেটা হচ্ছে টিকে থাকার যোগ্যতা। প্রাণী মাত্রের জন্যই পৃথিবী প্রতিকূল। সে সব প্রতিকূলতাকে সরাসরি অথবা কৌশলে বশ অথবা পরিহার করতে পারাকে যোগ্যতা বলে। টিকে থাকার প্রশ্নে প্রাণী চরিত্রে যে শিকার মনোবৃত্তির বিকাশ। এই শিকার সংক্রান্ত চিন্তা বলয়ের অধীনে মস্তিষ্কের যে প্রাকৃত অংশের বিকাশ তাকে বিজ্ঞান বলছে রয়্যাল কমপ্লেক্স।
ইতোমধ্যে মানুষ তার খাদ্য বাসস্থান বন্যা দুর্ভিক্ষ ভূমিকম্প কিংবা অগ্নু্যৎপাতের মত প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে। ইত্যাদি কারণে যাযাবর বৃত্তির যে প্রক্রিয়া তাকে গ্রহণ করতে হল। তার অবসর সময়চেতনা প্রকৃতির সাথে তার ভাব-অভাব অথবা বিপরীত লিঙ্গের প্রতি দুর্বোধ্য টান ইত্যাদির চিন্তাসমগ্রের বিকাশের ক্রমপথে মস্তিষ্কের অন্য প্রধান যে কর্টেক্সের আবির্ভাব বিজ্ঞান তার নাম রাখেন সেরিব্রল কর্টেক্স। যে কারণে মানুষ গান শোনে কবিতা পড়ে অথবা লেখে প্রেম করে শ্রদ্ধাবোধে জড়িত হয়, তার চোখে সহমর্মিতার অশ্রু গড়ায়।
পুরানা জমানায় কবিকুলের স্থান ছিল রাজসভা। তারা রচনা করতেন মহাকাব্য পুথি। এসব গীত হতো জনতার মাঝখানে, মুখে মুখে। বেশির ভাগ শাসকই ছিল দখলদার দস্যু অত্যাচারী প্রকৃতির। এদের মধ্যে ঘটেছে আর কমপ্লেক্সের চরমতম বিকাশ। ইতিহাসের কুখ্যাত শাসক চেঙ্গিজ খান। এই অশিক্ষিত পাশবিক শাসক যিনি সভ্যতার প্রভূত ক্ষতি করেছেন। তিনি শেষ জীবনে পাগল হয়ে উঠেছিলেন অমরত্ব পাবার আশায়। তার অমার্ত্যরা অমরত্বের দাওয়াইসহ অনেক চিকিৎসককে নিয়ে আসতেন তার কাছে। তিনি অই সব দাওয়াই তাদের খাওয়াতেন আর সাথে সাথে শিরচ্ছেদ করতেন । দেখতে চাইতেন মৃত্যুর পরও দাওয়াই গুনে তারা বেঁচে ওটেন কিনা। অবশেষে তিনি ঋষি মহাস্থবির কবি চানচুনকে তার দরবারে এনে অনেক লোভ দেখিয়ে জানতে চান অমর হবার কোনো দাওয়াই সম্পর্কে সে জানে কিনা। কেননা ততদিনে চানচুনের জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বজুড়ে। চানচুন সব প্রশ্নের জবাবে কোনো কথা না বলে শুধু চীনা কায়দায় তার বুড়া আঙ্গুল দুটি দেখালেন। আর বললেন অমর হবার উপায় প্রেম। তলোয়ার কিংবা রাজ্যজয় নয়। সত্যিই তো অবাক লাগে কত শত সহস্র রাজারানী গত হয়ে গেলেন। কবিতা বা কবি, হোমর বা লিওপার্দি, সেনেকা বা হাফিজ, রুমি জামি বা খৈয়াম, হুইটম্যান বা জন ডানের কবিতা বেচে আছে নির্বিঘ্নে।
আরেক শাসক তৈমুর যখন পারস্য দখল করলেন। সিরাজ নগরীতে একদিন তিনি ডেকে পাঠালেন সেই সময়ের প্রখ্যাত কবি হাফিজকে। তৈমুর কবিকে জিজ্ঞেস করলেন: কি লিখ শায়েরী? শোনাওতো একটা।
হাফিজ পড়লেন
আমার সিরাজ-বধূয়া যদি গো
দিল পরে মোর হাত বুলায়
পা’র তলে তার লুটিয়ে দেব গো
সমরখন্দ আর বুখারায়।।

তৈমুর ক্ষেপে গেলেন বহু বছর যুদ্ধ করে, শতশত সৈন্যর প্রাণের বিনিময়ে আমি সমরখন্দ দখল করেছি আর আপনি কিনা সিরাজের একটা মেয়ের জন্য তা বিলিয়ে দিতে চাইছেন?
হাফিজ নিজের ছেড়া পোশাকের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলে জাহাপনা দেখতেই পাচ্ছেন এই অমিতব্যয়িতার জন্যইতো আজ আমার এ দুর্দশা। আর সম্রাট বাবরতো একজন প্রকৃত কবি। যেখানেই তিনি যেতেন সেই এলাকার কবিদের খুঁজে বার করতেন। তার প্রচুর কালজয়ী বয়েত এখনো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নিয়মিত পাঠ্য। এই কবিতা প্রেমের জন্য তাকে বহুবার রাজ্য হারাতে হয়েছিল। শাসনকার্য ছিল তার জন্য অভিশাপ।
একজন কবি প্রকৃত অর্থে ঈশ্বর, স্বনির্মিতির। যখন একটি কবিতা সৃষ্টিকর্ম চলে তখন কবি সম্পূর্ণ একা অসহায় আর দ্বিধাদ্বন্দ্বে অস্থির একজন পোয়াতি মহিলার মত। তার ঐশ্বরিক স্বেচ্ছাচারিতা তার জীবনেও প্রতিফলিত হয়। এই স্বেচ্ছাচারিতার জন্য তাকে অনেক দুঃখ ভোগ করতে হয়। যদিও এই স্বেচ্ছাচারিতাই তাকে মৌলিক ও আলাদা করে। সে চায় একই সাথে প্রেম ও বিরহ, যুদ্ধ ও শান্তি। কারণ কে না জানে যে যত বেশি প্রেমিক সে তত বেশি বিদ্রোহী। যে কবি সে সম্পূর্ণ হৃদয়পন্থী উদ্বাস্তু। এই জন্য মায়াকোভস্কির ও এসনিনের কাছে জীবনের চেয়ে মৃত্যু অধিক মঙ্গলজনক। এইজন্য পূর্ব ইউরোপের কবিবৃন্দ হেরবেট, মিউশকে ভিনদেশে পাড়ি জমাতে হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নে স্তালিন জমানায় বিদ্রোহী কবি-সাহিত্যিকদের বলা হত শুয়াপোকা। এদের কপালে থাকতো নির্বাসন। বলা হত রুশিয়ার বাইরে থাকলেই এরা আপনা আপনি শুকিয়ে মরে যাবে। কিন্তু ইভান বুনিন, যোশেফ ব্রদস্কি, সলোঝিনিৎসিন, ইয়েভতুশেঙ্কু বিস্তার করেছে অনেক ডালপালা।
পোলিশ কবি চেশোয়াভ মিউশ যিনি কবিতায় একসময় বলেছিলেন কাকে বলে কবিতা যদি তা না বাঁচায় দেশ কিংবা মানুষকে, তাকেই আবার বলতে হয় কোনো দেশকে ভালবেসোনা দেশগুলো চট করে উদাও হয়ে যায়। কবিকে অবশ্যই খুঁজে নিতে হবে এমন কোনো প্রতিবেশ যেখানে তার কবিতা পড়ে আনন্দ পাবার যথেষ্ট অবকাশ আছে। যেখানে সে নিরাপদ প্রসব করতে পারে তার সন্তানাদি। পূরণ করতে পারে সন্তানসমূহের দাবি। এ কারণে রিলকের ত্যাগ মহৎ। মহৎ ও নৈতিক র্যাবোর অভিমান। কবিতা আত্মা সত্য আর মানবিকতার রক্তিম সংস্করণ। কবির জীবন কবিতার ওপর বিশাল প্রভাব রাখে।
ব্যক্তিগত অসৎ কবি সৎ ও মহৎ কবিতা লিখতে পারে বলে মনে হয় না। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন কবিকে পাবেনা খুঁজে তার কবিতায়। ভিন্ন অর্থে এটা আংশিক সত্য হলেও সামগ্রিক অর্থে মিথ্যে। কবিকে খুঁজে পাবার একমাত্র জায়গা হচ্ছে তার কবিতা। যে কারনে জনসাধারণ একজন কবির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে যদি অন্ধত্ব ও প্রচার তাকে ধ্বংস না করে।
ত্যাগ প্রসঙ্গে মার্কিন লেখক ক্যাথরিনা এন পোর্টার বলেন, সেও তো সভ্যতার অন্যতম দাবীদারদের একজন, কেন সে মধ্যবিত্ত মানসিকতাকে লালন করবে। কেন সেও একগাদা সন্তানের পিতামাতা হয়ে নিজের সময়গুলোকে প্রথাগতভাবে হত্যা করবে। বিশুদ্ধ কবিতার সন্ধানে আত্মাকে জাগিয়ে রাখতে রিলকে জার্মানির গ্রামে নানাবাড়িতে শিশুসন্তানকে রেখে সস্ত্রীক পাড়ি জমিয়েছিলেন পারিতে। যেখানে তিনি রদার ব্যক্তিগত সহকারী হিসাবে কাজ শুরু করেছিলেন। তার তরুণ কবিকে চিঠি বইটি যে কোনো মর্মসন্ধানী কবির জন্য গুরত্বপুর্ন।
নবী ঐশীপুরুষদের দিন শেষ। তাদের প্রায় সমস্ত গ্রন্থাদি থেকে কবিরা বিতাড়িত। তখনো এবং এখনো এই যন্ত্রযুগেও কবিই সভ্যতার রক্ষীবাহিনীর একমাত্র সর্বশেষ গেরিলাযোদ্ধা। কবিতাকে যারা নিষিদ্ধ করতে চেয়েছিল তারাই বলতে গেলে আজ নিষিদ্ধ। কিন্তু কবিতা বেঁচে আছে যেন কিছুই হয়নি এ রকম ভান করে।
যে কবি তার থাকবে সর্ব আঙ্গিককে গ্রহণ করবার ক্ষমতা। সর্বসময়ের জন্য তার দ্বার থাকবে উন্মুক্ত। কেননা তার অভিজ্ঞতা মিশে যাবে রক্তে। তাকে পান করতে হবে গোটা বিশ্বটাকে। প্রত্যেক কবি হৃদয়ের উৎসার বিশ্বহৃদয়ের ভেতর। তাকে জানতে হবে পৃথিবীর কোন কবি কি রেখে গেছে তার জন্য। এর পর আছে গ্রহণ আর বর্জন। এজরা পাউন্ড বলেন, কোন কবি কত পরিশ্রমী ও আন্তরিক তার প্রমাণ তার আঙ্গিক চেতনা। পাঠ ও অভিজ্ঞতার জন্য যেমন তার তৎপরতার দরকার তেমনি তার দরকার অলস সময়ের। অলস মস্তিষ্ক শুধু শয়তানের আড্ডাখানা নয় কবিতারও আড্ডাখানা। কবিতা লিখতে গিয়ে সম্মান অর্থ প্রতিপত্তি সব ভেসে যায়। চাকরি বাঁচানো ও জীবিকা চিন্তায় যে অস্থির এ পথ তার নয়।
কবি ইতোমধ্যে দুচোখ কালো কাপড়ে বেঁধে সম্পূর্ণ অজানার উদ্দেশ্যে পর্বতশিখর থেকে লাফ দেয়া একজন। সে জানে না কোথায় ভূপাতিত হবে। লাফ দেয়া আরভূপাতিত হবার মধ্যবর্তী সময়টাই কবি জীবন। প্রচার ও যশোলাভের অতিরিক্ত ইচ্ছা তাকে ভুল পথে নিয়ে চলে। কবিতা লেখা ও কবিতা খোঁজা ছাড়া এ সম্পর্কিত অন্য কোনো বিষয় যেমন যত্রতত্র কবিতা ছাপার প্রতিযোগিতা, ইতিহাসে স্থান পাবার জন্য ইদুর দৌড় তাকে হাস্যকর তুলতে পারে। প্রকৃত কবি ইতিহাসে স্থান চায় না, সে ইতিহাস তৈরি করে। মহামানুষ ও বৈজ্ঞানিকদের মত কবিও সভ্যতার জন্য অপরিহার্য। সে ক্ষেত্রে কবি নিজেও একজন পৃথিবীর অভিভাবক। পুরস্কারের সাথে তার সম্পর্ক নির্লিপ্ততার। সে ব্যস্ত নিরীক্ষয়। জীবনানন্দ যার সার্থক উদাহরণ। অমিয় চক্রবর্তী কবিজীবনকে বলেছিলেন বেদনার যুগ। সে ক্ষেত্রে কবির নাম দেয়া যায় বেদনার সন্তান।
মৃত্যু শয্যায় জীবনানন্দকে যখন প্যাথিড্রিন দেয়া হচ্ছিল তখন আচমকা তিনি বলেছিলেন আমি কোটি কোটি প্যাথিড্রিন নিয়েছি। এই উদ্ভট অসংলগ্ন চিৎকার থেকে বেরিয়ে আসে কবিজীবনের আদি সত্য। কবি নিজের মদে মাতাল। যে কোন ভাল নেশাখোরের সাথে রয়েছে প্রচন্ড মিল। পৃথিবীকে যে ঘর বলে মেনেছে তাকে ঘরে বেঁধে রাখা যায়না। যে হোমারের বংশধর সদাচারণশীল। সেতো সেই আত্মোন্মাদ বিশ্বহৃদয়েরই অংশ।
সময়ের সাথে সাথে কবিতার শরীরে একটা সু্ক্ষ পরিবর্তন আসে। এটা মৌলিক কবিরা দ্রুত বুঝতে পারে বলে মনে হয়। বিশেষ করে আঙ্গিক ও ভাষায়। যে কারণে একটার পর একটা মুভমেন্টের তৈরি হয়। যদিও আরোপিত কোনো কিছু স্থায়িত্ব পায়না। চিলির বিজ্ঞানী কবি নিকানোর পাররা লিখেছিলেন লিখ যা তোমার খুশি/ কেবল তা যেন শাদা কাগজের চাইতে উৎকৃষ্ট হয়। রবীন্দ্রনাথও প্রথমদিকে এই পরিবর্তন বুঝতে পারেন নাই। পরে তিনি নিজেই এই ধাঁচে লিখতে শুরু করেন, নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নি:শ্বাস। এ কবিতাটি আধুনিক কবিতার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
সত্যিকার অর্থেই কবিতা এক মেটাফিজিক্যাল থট। কিভাবে অভিজ্ঞতা এবং স্মৃতি একজন কবির ভেতর রসায়ন হয়ে শব্দ জাদুবাক্যে পরিণত হবার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে থাকে।
জি এম কোয়েতজি ফো নামের উপন্যাসে তা চমৎকার দেখিয়েছেন। উপন্যাসের চরিত্রের সাথে লেখকের যে আন্তর্নীতিক সম্পর্ক তা যে কোনো স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির সম্পর্ককে নির্দেশ করে। একই সাথে এ সম্পর্ক আনন্দ ও কষ্টের। বিষাদ ও একাকিত্বের। জনরুচির গালে এক থাপ্পড় মেরেছিলেন মায়াকভস্কি। মনে হয় যারা কবিতায় দুর্বোধ্যতার কথা বলে, মালমশলা নিয়ে চিন্তা করে আর কবিতা না পড়ার হুমকি দেয় কিংবা খুব বিনীত চাতুর্যের সাথে বলে সে একদা কবিতা পড়ত, সেও কবিতার পাঠক।
পাঠকেরও অন্তত কবিতাপাঠ মুহূর্তের সততার দরকার। তারও দরকার কবিতার সু্ক্ষ পরিবর্তনের সাথে সাথে নিজের রুচির পরিবর্তন সাধন করা। তিনি যদি এই সময়ের কবির কাছে নজরুলীয় বা রাবিন্দ্রিক কবিতা চান তবে তিনি অশিক্ষিত পাঠক। অতীতে জীবিত বর্তমানে মৃত।
কবিতার গণপাঠক কল্পনাতীত। কবিকেও নিজের কবিতা সম্পর্কে কঠোর হতে হয়। স্বরচিত অনেক কবিতা থেকে দাঁতের ডাক্তারের মত অনেক শব্দ লাইন তাকে উপড়ে ফেলতে হয়। ভূমিষ্ট হবার পর তিনি কবিতাটি সম্পর্কে হবেন অধিক যত্নবান অধিক নির্মম। পাঠকের তোয়াক্কা করবার সময় তার নাই। কারণ কবিতার যে পাঠক সেও কবি। একজন কবির মতই সেও ছন্নছাড়া মায়াবী ফকির।

পদ্মার পলিদ্বীপ: দ্বীপদেশের মহাকাব্য

শাস্ত্র মতে উপন্যাস মহাকাব্যের বংশধর। মহাকাব্যকে বলা যায় সাহিত্যের মাতৃক্রোড়। একদা মহাকাব্য চারণ কবিগণ মুখে মুখে আওড়াতেন। রাজা ও প্রজা যাকে নিয়েই রচিত হোক, মহাকাব্যগুলোতে একটা ব্যাপার লক্ষ্যণীয়- মাত্রাঐক্য। একই আবহের মধ্যে দিয়ে যেন ঘটনাপ্রবাহ এগিয়ে যায়। কোথাও এতটুকু বেতাল হচ্ছে না। সন্দেহ নাই সুর কেটে গেলে সেটা মহাকাব্য হিসাবে অসফল।
ধারাবাহিকতা, কাহিনীর সমন্বিত বিস্তার, সময়োপযোগী ডিটেল ও ভাষার ব্যবহারই মূলত একই লয়ে তাকে ধরে রাখে। শালোকভের বয়ানে-উপন্যাসিকদের সঙ্গীত জ্ঞান জরুরী। সব সফল মহৎ উপন্যাস গুলোতে এই মহাকাব্যের গভীরতা বিদ্যমান। মহাত্মা বালজাক এই কারণে তার উপন্যাসমালার নাম রাখেন হিউম্যান কমেদিয়া। এই উপন্যাসমালার প্রতিটি উপন্যাস মিলে যেন একটা মহাকাব্য। ফরাসী সমাজের সব ধরনের চরিত্র তাতে বিদ্যমান। শালোকভের বৃহৎ উপন্যাস প্রশান্ত দনে শত চরিত্রের ঘনঘঠা বহু ঘটনার বিস্তার। বলা যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ,দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, রুশীয় গৃহযুদ্ধ থেকে অক্টোবর বিপ্লব পর্যন্ত, কিন্তু পুরা উপন্যাসের পরতে পরতে যেন একই ধারার সঙ্গীত বেজে চলেছে। কখনোই কেন্দ্রচ্যুত হয়ে ছিটকে পড়তে হয়না পাঠককে।
তলস্তয়ের মহাকাব্যিক উপন্যাসসমূহ আনা কারেনিনা, পুনরুজ্জীবন। দস্তয়েভস্কির কারামাজভ ভাইয়েরা, অপরাধ ও শাস্তি অথবা স্তাদালের লাল ও কালো। মহাকাব্যর একটা পর্যায় ছিল যখন তা লিখিত হতো  দেব দেবীদের নিয়ে। নিদেন পক্ষে রাজা বাদশা আমির ওমরাহদের নিয়ে।
কেননা রাজাবাদাশাহরাই ছিলেন তৎকালে কবিদের  পৃষ্টপোষক।
কিন্তু ইতোমধ্যে মানুষ যুদ্ধে, ভূমিকম্প,অগ্ন্যুৎপাত, রোগে, মহামারীতে নিজের অভিজ্ঞতাতো সম্মৃদ্ধ করলোই তদোপরি নিজের সীমাটাকে সে নির্ধারণ করতে পারলো। চিহ্নিত করতে পারলো তার অসহায়ত্বকে। এমনকি তলস্তয়ের চরিত্র সমূহ নেখলেয়ুদভ অথবা কনস্তানতিন লেভিন, ব্রনস্কি, কারেনিন অথবা পিটার, সুফিয়া প্রায় সব চরিত্র ধনতন্ত্রের প্রতিনিধি বইতো নয়! প্রলেতারিয়েত চেতনা থাকা সত্বেও লেভিনও তাই। যাইহোক আধুনিক কালের উপন্যাসই মহাকাব্যের বংশধর হিসাবে উত্তম। বিশ্বসাহিত্যে সম্ভবত দস্তয়েভস্কিই সেই মহৎ উপন্যাসিক যার শুরু থেকেই চরিত্ররা একেবারে সাধারণ মানুষ।
দস্তয়েভস্কি গোগল সম্পর্কে বলেছিলেন গোগলের ওভারকোট এর পকেট থেকে আধুনিক রুশ সাহিত্যের জন্ম। দস্তয়েভস্তি সম্পর্কেও বলা যায় যে আধুনিক উপন্যাসেরও জন্ম তার রাসকলনিকভে। তার চরিত্র সমূহে। কার্যত দস্তয়েভস্কি ও বালজাকের পর উপন্যাস আর আগের মত থাকে নাই। ব্রাত্য অন্তর্মুখী অভাজনেরাই আধুনিক মহাকাব্য তথা উপন্যাসে প্রধান চরিত্র হয়ে আসতে লাগল। এবং উপন্যাসে সাধারণ মানুষের স্থান বলা যায় চিরস্থায়ী হয়ে গেল। যদিও এই সাধারনত্বের গোত্রভিত্তিক রূপ দিতে গিয়ে প্রকৃতিবাদি এমিল জোলা, কুপ্রিন, মপাসা প্রমুখ উপন্যাসকে প্রায় পর্ণের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।
মহৎ উপন্যাসিক সময় উপত্যাকার চারিদিকে আধ্যাত্বিক পরিভ্রমণরত। সমস্ত বিষয়টিকে, যে বিষয় নিয়ে সে কাজ করে, মানসচক্ষে দেখতে পায় বলে একটা মাত্র কাহিনীতে তাকে ধরে রাখতে পারে।
আবু ইসহাকের পদ্মার পলিদ্বীপ বইটির আলোচনা করতে গিয়ে উর্ধ্বাংশর ভুমিকাটুকুর অবতারণা করতে হল কেননা এই বইটি মহাকাব্যের লক্ষনাক্রান্ত। বইটি পড়তে পড়তে শালোকভের  প্রশান্ত দনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল বারবার। একজন মহৎ ও পাক্কা ঔপন্যাসিকের সবগুণে আবু ইসহাক গুণান্বিত।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত অধিকাংশ গল্পই অরুচিকর নিম্নমানের হয়। আবু ইসহাকে জোক গল্পটি মাধ্যমিকে পাঠ্য ছিল একসময় কিন্তু সিলেবাসভূক্ত ছিল না। কৈশোরে এই গল্পটি পড়েই বুঝতে পেরেছিলাম আবু ইসহাকের লেখনীরে শক্তি।
আবু ইসহাকের সাহিত্যকর্ম মোট পাঁচটি বইয়ে সীমাবদ্ধ। মহাপতঙ্গ, হারেম, সূর্যদীঘল বাড়ি, পদ্মার পলিদ্বীপ ও জাল।
পদ্মাপারের জেগে উঠা চরের মতই দ্বীপাঞ্চলের অনিশ্চিত মানুষের গল্প লেখেন তিনি। পদ্মাপারের মাটির মানুষ আর তাদের ভাষা আর তাদের ভেতর দিয়ে উপনিবেশবাদের অক্টোপুশি চেহারাকেই তিনি উন্মোচিত করেন। এ উপন্যাসের নায়ক ফজলের মতই যেন তৃতীয় বিশ্ববাসি।
ফজল একদিন মাছ ধরতে গিয়ে দেখতে পায় তাদের পুরানা দখলকৃত খুনের চর আবার জেগে উঠেছে। সে তার বাবা মাতব্বরকে খবর দেয়। কোলশরিকদের নিয়ে মাতব্বর চরটি পুন:দখল করে।
কিন্তু উপনিবেশবাদি জাঙ্গরুল্লা চরটি দখল করার পায়তারা করে। তার অভিনব কৌশলের কাছে সহজেই পরাস্ত হয় ফজলরা। চরের পাশে একটি ডাকাতি হয়েছে এই মর্মে থানায় এজাহার দেয় জাঙ্গরুল্লা। জাঙ্গরুল্লার পয়সা খাওয়া পুলিশ বাহিনী মিথ্যা মামলার আসামী করে ফজলকে। ফজলরা পালিয়ে গেলে দ্রুত চরটির দখল নেয় জাঙ্গরুল্লা। অন্যান্য উপনিবেশবাদিদের মতই জাঙ্গরুল্লা এক পিরকে ধরে এনে ধর্ম প্রচারের আস্তানা গড়তে চায় এই চরে।
আবু ইসহাক পদ্মার পলিদ্বীপ রচনা করেন ১৯৮৬ সালে। ততদিনে মার্কিন সাম্রাজ্য বিকশিত হয়ে ডালপালা গজিয়েছে। তিনি জানেন সাম্রাজ্যবাদীরা নব নব পন্থায় সাম্রাজ্য বিস্তারের পায়তারা করে। আবার এই জুলুম কে জায়েজ করার জন্য তাদের দরকার হয় ধর্মীয় নৈতিকতার আধার। হিংসার চরমতম রূপ যুদ্ধকে তারা নাম দেয় ক্রুসেড। তারা লুন্ঠনকে করে তোলে ধর্মপ্রচারের সফর। চিরদিন এই দুটি ব্যাপার একই মুদ্রার এপিট ওপিট হিসেবে চলে আসছে।  লেখকের অন্তর্দৃষ্টির গভীরতা বয়ানের সত্যতা এ উপন্যাসের জাঙ্গরুল্লা চরিত্রটি বিশ্লেষণ করলে মেলে। বুঝা যায় উপনিবেশ বাদিতা অশেষ। উপনিবেশবাদিতা প্রজাতির রক্তিম বৈশিষ্ট। প্রতিটি মানুষের ভিতর রয়েছে রাজত্ব করবার  বৈশিষ্ট। দখলপ্রবৃত্তি মানুষের অতি পুরাতন বাসনা। যা কিছু আনন্দ দেয়, শৌর্য দেয়, বীর্যবান করে সবই তার দখলে চায়। জাঙ্গরুল্লার দখলে অনেক চর। তার অনেক লাঠিয়াল, অনেক শক্তি। বহু মিত্র, কোলশরিক। তবু যেই শুনেছে খুনের চরে ভাল ধান হচ্ছে। খুনের চর থেকে মাছ ধরে সহজে দুই পয়সা কামাই করা যায়। তখনই তার মাথায় ঝিলিক দিয়ে ওঠে লোভ, তার ঘুম হারাম হয়ে যায়। কী উপায়ে এই দ্বীপ দখল করা যায়। এটাই তো সাম্রাজ্যের মন। যখন মানুষের দখলসত্তা জেগে ওঠে তখন সে একটার পর একটা পরিকল্পনা করে, কিভাবে সে তা দখল করতে পারে। এই জন্য সে মিছা ডাকাতির মামলা সাজায়। ফজল ধরা পড়ে জেলে যায়। সাক্ষী জাঙ্গরুল্লার লোকজন আর তার মতা আর তার টাকা।
পৃথিবীতে এ পর্যন্ত যত সাম্রাজ্যবাদীদের উত্থান ঘটেছে। ইতিহাস সাক্ষী দেয় প্রত্যেক দখলদারিত্বের আগে তারা মিথ্যাচারের জন্য নগ্নভাবে মিড়িয়াকে ব্যবহার করে। এডওয়ার্ড সাঈদের কাভারিং ইসলাম ও আফটার দ্যা লাস্ট স্কাই বইসমূহ  এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। বিবিসি, সি এন এন এর মত নিউজ ব্রডকাস্টিংগুলোকে নিজেদের স্বার্থে পশ্চিমারা কি জঘন্যভাবে ব্যবহার করে বইগুলো তার সাক্ষ্য দেয়। এই কিছুদিন আগেও নিউজ এজেন্সিগুলোর বরাতে সাদ্দাম হোসেনকে মনে হত বিশ্বত্রাস। যে কোনো মুহূর্তে দুনিয়াকে নরকে নিয়ে যাবার মতা যেন তার রয়েছে। ভাবখানা ছিল এমন। কত সহজেই না মার্কিনিরা ইদুরের মত লেজ ধরে গর্ত থেকে তুলে এন লটকে দিল ফাঁসিতে।  এই যে ওসামা বিল লাদেন কে খোঁজার নামে কাবুলকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে প্রস্তর যুগে। সন্দেহ হয় আসলে ওসামা বিল লাদেন বলে কেউ আছে কি ? যে মার্কিনিদের বোমা বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে পাহাড়ে খানাখন্দে তেলাপোকার মত বেঁচে আছে। এই সবই কি উপনিবেশ বিস্তারের বা বিস্তারিত উপনিবেশকে পোক্ত করার জন্য অভিনব কৌশল নয়? আসলে ঘঠনা পরম্পরা বিবেচনা করলে দেখা যায় সবকিছুর মুলে চরদখল।
মাছ ধরতে গিয়ে নদীতে মরে যায় জরিনার স্বামী অসুস্থ চোর মতলব। এতবড় ইস্যু কি ছাড়তে পারে জাঙ্গরুল্লা। সে রটায় ফজলই খুন করেছে মতলবকে। উপন্যাসের শেষার্ধে যদিও উপন্যাসিক ফজলকে দিয়ে পুনরায় দখল করায় খুনের চর। কিন্তু মানুষকি আদৌ এত আশাবাদি হতে পেরেছে? জাঙ্গরুল্লার কোলশরিক ফজলের শ্বশুর যখন ফজলের বউ রূপজানকে বিভিন্ন ছুতোয় আটকে রাখে নিজের বাড়ীতে। তখন ফজলই বুদ্ধি করে জাঙ্গরুল্লার লোক সেজে রূপজানকে তুলে নিয়ে আসে। এটাই আসলে টিকে থাকার মেটাফর। ফজল-জরিনা-রূপজান কেন্দ্রিক প্রেম কাহিনীটা এ উপন্যাসকে আরো বেশি চিরন্তন করে তোলে।
প্রসঙ্গত জাল উপন্যাসে আবু ইসহাক একটা  ভুমিকা লেখেন। তার ভাষায় আমার প্রথম উপন্যাস সুর্যদীঘল বাড়ি লেখা শেষ হয় ১৯৪৮ সালের আগষ্ট মাসে। তারপর চার-চারটে বছর প্রকাশকের সন্ধানে কলকাতা ও ঢাকায় ঘোরাঘুরি করেও বইটির প্রকাশক পাইনি। এত আহত হয়ে তিনি ভাবলেন মৌলিক উপন্যাস যখন কেউ ছাপেনা  ডিটেকটিভ উপন্যাস লিখবেন। এরই ফলশ্রুতিতে তিনি জাল লেখেন। কিন্তু পাঁচবছরের মাথায় তিনি সুর্যদীঘল বাড়ির প্রকাশক পান এবং এটার সফলতা দেখে জাল এর পান্ডুলিপি বাক্সবন্দি করেন। প্রায় ৩৪ বছর জাল এর পান্ডুলিপি বাক্সবন্দি অবস্থায় ছিল। বাংলাদেশের প্রকাশকদের মত অশিক্ষিত কোনো সম্প্রদায় নাই। এদের কারণে বলা যায় ব্যবসা চিন্ত আর নোংরা মানসিকতা আর সস্তা রুচির কারণে এ দেশিয় সাহিত্য এখনো আতুড় ঘরেই রয়ে গেল। এখনো যে দেশে বই ছাপা হবার যোগ্যতা হচ্ছে আমলা হওয়া, পত্রিকার সম্পাদক হওয়া অথবা প্রকাশকের বউয়ের ভাই হওয়া। এদের হাতেই বন্দি এ দেশিয় সাহিত্য। মেলা আসলেই দেখা যায় এই মুর্খ অশিক্ষিত প্রকাশকদের কুরুচিপুর্ণ নিম্নমানের অপন্যাসে ভরে যায় বটতলার বইয়ের স্টলগুলো। এদের দৌরাত্ব্য ও নিষ্ঠুরতার বলি হয় আবু ইসহাকের মত মৌলিক অর্ন্তদৃষ্টি সম্পন্ন লেখকরা।

Thursday, December 10, 2009

মাই ফিউডাল লর্ড অথবা তাহমিনা দুররানির পাকিস্তান

শুধু বাংলাদেশে জন্মেছি বলে নয়। আমার এই বয়সে আন্তর্জাতিকভাবে পাকিস্তানিদের বদনাম ছাড়া কোনো সুনাম শুনিনাই। যদিও পাকিস্তানে আহমাদ ফায়েজ, ইকবালদের মতো কবি ছিল। একবাল আহমদের মতো চিন্তক ছিল যে কিনা ওয়াদি সাঈদের গুরু ছিল। অবশ্য এরা প্রত্যেকেই প্রায় জীবনের সিংহভাগই দেশের বাইরে অতিবাহিত করেছে। প্রাশ্চাত্যে যে সমস্ত এশিয়ান লেখকরা বাস করে তাদের লেখাও আমরা এখন দ্বিধাচিত্তে গ্রহণ করি। বিশেষ করে সালমান রুশদি আর নীরদ সি চৌধুরীর পর। অনেক আগে সংগৃহীত তাহমিনার এই বইটি পড়ি সম্প্রতি।
পড়তে শুরু করে মনে হলো হয়তো আরেকটা দক্ষিণ এশিয়ার রগরগে কাহিণী পড়বো। কারণ কিছুদিন আগে শোভা দে আর রাধিকা ঝার দুটি বই পড়ে সেই অভিজ্ঞতা হয়েছিল।

পুরা কাহিনীটা পড়লে বুঝা যায় পাকিস্তানের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নিজের বঞ্চনার প্রতিকারহীন প্রতিবাদের জন্য তার এই কলম ধরা। কারণ তাহমিনা নিজেও ইতোমধ্যে রাজণীতিবিদ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত। তবুও মুস্তফা খারের মতো সামন্তীয় রাজনীতিকের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি রাজনীতীতে কেবলমাত্র একজন নারীর হওয়ার কারণে তার কিছু করার থাকেনা। কারণ পাকিস্তানের গণ মানুষও নারীদের কোনো সম্মান দেয়না বা তাদের কথা বিশ্বাস করেনা যতক্ষণ পর্যন্ত না সে অন্য এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিকের ফেলাচ হিসাবে কাজ না করছে। যেমন বেনজীর ভুট্টো। বেনজীর ভুট্টো ছিল ভুট্টোর
ফেলাচ। যেমন আমাদের দেশে খালেদা জিয়ার আর হাসিনা মুজিবের।
মুস্তফা খার যতদিন জেলে ছিল পাকিস্তানি জনগণ রাজনীতিতে তাহমিনাকে মেনে নিয়েছে যখন খার জেল থেকে বের হলো। জনগণে চিন্তা ঘরের মেয়ে ঘরে ফিরে যাও।
মাই ফিউডাল লর্ড মূলত পাকিস্তানের সামন্তীয় রাজনীতিবিদ মুস্তফা খার কাহিনী।

যদিও তাহমিনার আত্মজীবনীমুলক লেখা। কারণ তার জীবনের বেশিরভাগ সময় মুস্তফার মতো একজন সামন্তীয় প্রভুর স্ত্রী হিসাবে কাটে।
তাহমিনার মতে মুস্তফা নেহায়েত উচ্ছাবিলাসী এক নেতা। আবার স্বভাবের দিক দিয়ে যে পেয়েছে আফগান উত্তরাধিকার। যাদের জীবনে মেয়েমানুষ হচ্ছে স্রেফ অত্যাচার আর ভোগ করবার যন্ত্র। এতে অন্যকোনো ধারণা নাই। ধর্মীয় বা ঐতিহাসিক। ক্ষমতার বলে তাহমিনা সহ প্রায় সাতজন মহিলাকে সে বিয়ে করেছে। সবাই পাকিস্তানের উচ্চবংশীয়। নারী শিকারের নেশা আর কৌশল দুটোই তার আয়ত্তে। প্রায় প্রত্যেকের কপালে ছিল সন্তান হয়ে যাবার পর মোল্লাতান্ত্রিক গ্রামে নির্বাসন। এবং কোনো ধরণের যোগাযোগ হীন তিল তিল মৃত্যু। তাহমিনাই একমাত্র স্ত্রী যে কিনা অনেক শারীরিক নির্যাতন সহ্য করেও তাণ্ডবের মুখে নিজেকে রক্ষা করবার ক্ষমতা দেখিয়েছে।
তাহমিনার কথা হচ্ছে অধিকাংশ পাকিস্তানি নেতাদের মানসিকতা মুস্তফা খার মতোই সামন্তীয়। যাদের কোনো আদর্শ নাই। ক্ষমতায় যাবার জন্য তারা সবকিছু ত্যাগ করতে পারে। তাদের মুল আগ্রহ হচ্ছে স্বচ্ছল ভোগী জীবন যাপনে। ধম তাদের ব্যবহারের অস্ত্রমাত্র।
মুস্তফা খার যে চরিত্র তাহমিনা রূপায়ণ করেছেন। তাকে বিশ্বাস করবার যতেস্ট অবকাশ আছে। কিন্তু তাহমিনার প্রথম স্বামী নীরিহ আনিসকে ধোকা দিয়ে তাহমিনা যেভাবে উচ্ছাবিলাসী হয়ে মুস্তফা খার দৃষ্টি আকর্ষণ করার প্রয়াস পেয়েছে তাতে পাকিস্তানি উচ্চবংশীয় নারীদের জীবনদর্শণ নিয়েও প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ, ইসলামী বিশ্বের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক ও আফগান নিয়ে সোভিয়েত আমেরিকা পাকিস্তানের ত্রিমুখী সম্পর্ক ও তার পরিণতির কারণে লেখাটা শুধু মুস্তাফা খার জীবনী বা তাহমিনার আত্মজীবনী হয়ে থাকেনি। হয়ে উঠেছে দক্ষিণ এশিয়ার একখণ্ড ইতিহাস। যা ইচ্ছা করলে বিনির্মাণ করা যায়।
তার গদ্য সরল-স্বাবলিল তরতরিয়ে পড়া যায়।

Wednesday, December 2, 2009

চেশোয়াভ মিউশ : আধুনিকোত্তর বিশ্বকবিতার স্ববিরোধী যুবরাজ

কজন কবি হচ্ছেন সেই স্বৈরাচারী শাসক আপাত চোখে যাকে সবার দরকার, যার কারো দরকার নাই। সত্যিকারের একজন কবি ঈশ্বরের মত ক্ষমতাবান। এই জন্য জনসাধারণের রুচি থেকে তার রুচি বহুত তফাতে। জনসাধারণের কাছে মাঝে মাঝে সে হাস্যকর। হ্যাঁ কবি হয়ত তার লম্বাচুল, হয়ত তার উদাসী স্বপ্নালু চোখ, হয়ত সে মদ খায়, হয়ত সে মাতাল, হয়ত সে ঈশ্বর আর ধর্মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী_মায় নাস্তিক। ততক্ষণ সে নিরাপদ জোকার যতন তার স্বধর্ম সে জনসাধারণের উপর চাপিয়ে দিতে চায়না। আর সত্যিকার অর্থে যখন তা ঘটে তখন সে জনগণ,ধর্ম আর প্রথার শত্রু। আমি আগেই বলেছি কবি এমন এক স্বৈরাচারী আত্মা যার কোন লোকজন নাই। ফলে রাষ্ট্রীয়-ধর্মীয়-প্রথাবাদী সন্ত্রাসের কাছে সে হয়ে পড়ে অসহায়। ফলত সে নিহত হতে পারে। তার মতামতের জন্য। যদি তাও না হয় তবুও সে নির্বাসিত কিংবা পলায়ন বাদি। সত্যিকারের একজন কবি গ্রামে বা নগরে সে আত্মনির্বাসিত। কবিদের নিরাপদ বাসস্থান হিসাবে চিহৃত এমন কোনো জনপদ দুনিয়াতে নাই। তার নিবিষ্টতা দরকার, প্রয়োজন আত্ম মগ্নতা। আমার বিশ্বাস হট্টগোলের ভেতর কবিতা তৈরী হতে পারে না। একজন কবি অনেক কিছুই জানে। কিন্তু সে বলতে পারেনা সে কি কি জানে আর কি কি জানে না। মহত্তর কোন কবিকেও যদি পুচ করা হয়'কাকে বলে কবিতা'। তাহলে আমার বিশ্বাস সেন্ট অগাস্তিনের মত সেও বলবে যদি আমাকে পুচ করা হয় ত আমি জানি না। না হয় জানি। আর কুড়ি জন কবিকেও এই একই প্রশ্ন করা হয় তাও মনে হয় কুড়ি জনের অনুভুতি হবে কুড়ি রকম।
'কাকে বলে কবিতা যদি তা না বাঁচায় দেশ কিংবা মানুষকে'। এভাবেই চেশোয়াভ মেউশ বিশ্বিত হয়েছিলেন তার প্রথম দিকের এক কবিতায়। গত শতকে তিনি তখন নাজি বিরোধী প্রতিরোধ কমিটির লগে তলাকার রাজনীতিতে। প্রায় একটা ব্যাপারে ভেবেছি যে পৃথিবী যেমন পরির্বতীত হয় নিরন্তর যেমন গত একশ' বছর আগেকার মানুষের পোশাক দেখে আমাদের হাসি পায় এই সময়ে বসে। একজন কবির চিন্তাও এভাবে পরির্বতীত হতে থাকে। তার চিন্তা প্রসারিত হতে হতে তার ধারণা গুলো বদলাতে থাকে। এই জন্য একজন কবির প্রথম দিকদার কবিতার লগে পরিণত বয়সের কবিতার চিন্তার তফাত হতে পারে। হতে পারে স্ববিরোধীতাও। পরে তার মধ্য বয়সের রচিত আর এক কবিতায় তিনি বলেছেন 'কোনো দেশকে ভালবেসো নাঃ দেশগুলো চট করে উদাও হয়ে যায়... মানুষকে ভালবেসো নাঃ মানুষ চট করে ধ্বশে যায়। এখানে মিউশের স্ববিরোধীতা লক্ষণীয়। প্রথমার্ধে তিনি বললেন কবিতাকে হতে হবে দেশ ও মানুষের বাচার উপায়। দ্বীতিয়ার্ধে তিনি বলছেন মানুষ আর দেশকে ভালবেসোনা। এভাবেই কবির ধারণাসমুহ বদলাতে থাকে। কবি স্ববিরোধী হতে পারে। তিনি দার্শনিক নন। এ ব্যাপারে পার্টিজান রিভিয়্যুতে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জবানবন্দি দেন।
'আমি স্ববিরোধীতায় পূর্ণ মানুষ। সেটা অস্বীকারও করবোনা। আমি ফরাসি দার্শনিক ওয়েইল সিমঁর লেখা পত্র অনুবাদ করেছি তিনিতো পরস্পর বিরোধীতার সমর্থক। আমার দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় রয়েছে। এরকম ভান করা আমি পছন্দ করিনা।' এটা ছিল আসলে পরিবর্তনের সমস্যা। কম্যুনিজম অনেকটা নারীর মত। যখন মানুষ সাম্যবাদি সমাজের স্বপ্ন দেখে সেটা প্রেমে পড়ার মত ব্যাপার। তখন সে ঝাপিয়ে পড়ে তার আদর্শ সমাজের বাস্তবায়নে আর যখন সেটা বাস্তবায়িত হয়ে যায় তখন সৃজনশীলরা বিশেষ করে কবিরা গুটি গুটি পায়ে বেরিয়ে আসেন। তাদের পরিণতি হয় দাগা খাওয়া প্রেমিকদের মত। হয়ত পালিয়ে যায় তারা দেশ থেকে হয়ত কেও বেছে নেয় আত্মহনন। এটা দেখা গেছে কম্যুনিষ্ট শাসিত প্রায় সকল দেশেই। প্রাক্তন সোভিয়েত থেকে শুরু করে পূর্ব য়ুরোপের দেশ গুলোর দিকে তাকালে আমরা তা অনুধাবন করতে পারি। এই ব্যাপারে পোল্যান্ডের আরেক কবি ভিসুয়াভা সিম্বোর্সকা তার এক সাক্ষাৎকারে জবান দিয়েছিলেন। তার কাছে প্রশ্ন রাখা হয়েছিলো' কমুনিজম পছন্দ করতেন আপনি, লিখতেন বস্তুবাদি দৃষ্টিভঙ্গিতে আর এখনো কি তাই? সিম্বোর্সকা বলেছিলেন" খুব মুশকিলে ফেললেন। এই সময়ের মানুষ সেই সময়টাকে বুঝতে পারেনা। মানবতাকে রক্ষা করতে চাইছিলাম আমি। কিন্তু আমি বেছে নিয়েছিলাম ভুল পথ। মানবজাতির প্রতি ভালবাসার কারনে এটা করেছিলাম। কিন্তু আমি বুঝতে পেরেছিলাম পরে যে মানব জাতিকে ভালবাসা উচিত নয়। আপনি বরং তাদের পছন্দ করতে পারেন। পছন্দ! তবে ভালবাসা নয়। মানবতাকে আমি ভালবাসি না, আমি ব্যক্তিসত্ত্বাকে পছন্দ করি। আমি মানুষকে বুঝার চেষ্টা করি, তবে তাদের কোন সমাধান দিতে পারি না। তিনি আরো বয়ান করেছিলেন' সেটা ছিল আমার জন্য খুবই কঠিন কাজ। এটা ছিল আমার তারুণ্যে এক ভুল। ভাল বিশ্বাস থেকে এটা হয়েছিল। এবং দূভার্গ্য বশতঃ প্রচুর কবিই এ কাজটি করেছিলেন। পরবর্তীতে তাদের আদর্শ পরিবর্তনের জন্য তাদেরকে জেলে যেতে হয়। সৌভাগ্যক্রমে আমি ঐ নিয়তি থেকে রেহাই পাই, কারণ প্রকৃত রাজনৈতিক কর্মীর স্বভাব আমার কোনদিন ছিলনা।'
এরপর স্বভাবতই পোলিশ কবি সাহিত্যিকরা ঝুকে ছিলেন ব্যাক্তিস্বাতন্ত্র্র্যের দিকে। তবে এ দফায় মিউশের ব্যপারটা আলাদা। মিউশের প্রথম দিকের কবিতায় উচ্ছাস থাকলেও মধ্য ও শেষ পর্বে তার কবিতা খাটি দার্শনিকতায় ঋদ্ধ। তার প্রথম দিকের একটি কবিতা।
'প্রথম যে আন্দোলন, সে হল গান করে উঠা/ অবাধ এক কন্ঠস্বর, গিরি প্রান্তর ভরাট করা/ প্রথম যে আন্দোলন সে উল্লাস/ কিন্তু তাকে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়/ ।
এসব কবিতার সাথে যে কোনো কবি একাত্ম হয়ে যেতে পারে। একজন কবির আভ্যন্তরীণ বির্বতন এসব লাইনে প্রখর হয়ে উঠে।
'আর এখন বছরগুলো রূপ বদল ঘঠিয়েছে আমার রক্তের/ আর হাজার হাজার নিহারীকার জন্মমৃত্যু হয়েছে আমার দেহে/ আমি বসে থাকি ধূর্ত আর রাগী এক কবি/ অভিশাপে কুচকে যাওয়া চোখে প্রতিশোধের/ । তবুও তিনি আশাবাদি থাকতে চান।
'কেউ কেউ আশ্রয় খোজে নিরাশায়, যা কিনা/ কড়া তামাকের মত মিষ্টি/ যেন বিনাশের সময় পান করা এক গেলাশ ভোদকা/ এরপর তিনি সিদ্ধান্ত করেন।'কিন্তু আমার হাতে বর্তেছে এক বিশ্বনিন্দুকের আশা/ কারণ আমি চোখ মেলেই দেখেছি, শুধু আগুনের ঝলক, নিধন আর ধ্বংশ/ শুধু অবিচার লাঞ্চনা আর হাম্বড়াদের হাস্যকর লজ্জা/ আমারি ওপর বর্তেছে অন্যদের উপর প্রতিশোধ নেবার দায়, আর নিজের ওপরও/ আর সে নিজের পরিচয় দিচ্ছে এভাবে-কারন আমিই ছিলাম সেই লোক যে সব জানত/ কিন্তু সেই জ্ঞান থেকে যে নিজের জন্য কোন মুনাফা নিঙড়ে নেয়নি/।
একজন কবিকে বুঝতে হলে বস্তুত তার জীবনকেও বুঝতে হবে। কারণ সেই কবিই মহৎ যার জীবনের সাথে তার কবিতার সখ্যতা আছে। জীবনবোধ কবিতার কাছে অনেক মুল্যবান। আর এই জন্য পৃথিবীর অধিকাংশ মহৎ কবিদের জীবন হচ্ছে দূদর্শা আর লাঞ্চনার ইতিহাস। রিলকে বলতেন'প্রতিভা হচ্ছে যন্ত্রনা সহ্য করবার মতা'। এক অবর্ণনীয় দুঃখবোধ সমস্ত জীবনের আবরণ ছিল গিওকোমো লিওপার্দির। এ ব্যাপারে দার্শনিকরাও কবিদের উপর কম ক্ষ্যপা ছিলেন না।
প্লাতোনীয় সক্রাতেস সিদ্ধান্ত করেছিলেন' কবির সৃষ্ট সত্যর মুল্য অতি নগন্য। কবির আবেদনও আমাদের আত্মার অধম অংশেরই নিকট। এবং একারনে আমাদের সুশাসিত রাষ্ট্রে কবির প্রবেশ নিষিদ্ধ করলে আমরা সঠিক কাজই করব। কারণ যুক্তির বিনিময়ে কবি আমাদের আত্মার অধম উপাদান গুলোকে উত্তেজিত করে তুলে। এ গুলোকে সে উৎসাহিত এবং শক্তিশালী করে তোলে। আত্মার অধম অংশকে প্রবল করার অর্থ রাষ্ট্রের ক্ষমতা এবং পরিচালনার ভার নিকৃষ্টতম চরিত্রের হাতে তুলে দেয়া। এবং রাষ্ট্রের উত্তম চরিত্রের ধ্বংশ সাধন করা।'
সক্রাতেস নিজেই একজন কাব্যবোদ্ধা ছিলেন। তিনি প্রায়শই আদর্শ রাষ্ট্রের রূপরেখা টানতে গিয়ে হোমার থেকে উদ্ধৃতি দিতেন। তাহলে আমরা এই সিদ্ধান্ত করতে পারি যে কবিকে বুঝতে না পারার ব্যামোটা আজকের নয়।'কবিতা কেন লেখে একজন কবি' এই ধরনের প্রশ্নে কবিরা রেগে উঠতে পারেন। কারণ সাহিত্যের ইতিহাস বস্তুত: কাব্যের ইতিহাস
যদিও আমরা মহাকাব্যের যুগ পেরিয়ে কবিতার আরও অনেক স্তর পেরিয়ে এসেছি।
চেশোয়াভ মিউশের কবিতায় এক দার্শনিক নি:সঙ্গ চেতনা লুকায়িত আছে। তার জবান' এক সকালে ইউনিভার্সিটির ক্যাফেয় বসে আছি, একটা কন্ঠস্বর শুনতে পেলাম যেন। এর ফলে কবিতাটা লিখে ফেললাম।' আমার বাবা মা, আমার স্বামী,আমার ভাই, আমার বোন/ প্রাত:রাশ খেতে খেতে একটি ক্যাফেটেরিয়ায় আমি শুনতে পাচ্ছি/ নারীদের কন্ঠস্বরের মর্মর ধ্বনি, পূর্ন করছে নিজেদেরকেই/খুব দরকারি এক আচার অনুষ্ঠানে/ আমি তাদের স্পন্দিত ঠোঁটের দিকে পাশ থেকে এক ঝলক থাকাই/ এবং এই পৃথিবীতে আছি বলে উচ্ছ্বল হয়ে উঠি। এই পৃথিবীতে তাদের সংঙ্গে আর একটা মুহুর্ত থাকতে পারব তার জন্য/ ক্ষুদ্র,অতিক্ষুদ্র আমিত্বকে উদযাপন করবার জন্য/'। মানুষ বস্তুত:আমিত্বময় একটা প্রাণী। শুধু মানুষই নয়,প্রায় সমস্ত প্রাণী কুলেরই এই বৈশিষ্ট্য আছে। এই কারনে আত্মরক্ষা রাটা হচ্ছে মানুষের প্রধান জৈবিক প্রকরণ। আমি বেঁচে আছি,এই আমি। মিউশের নি:সঙ্গতা অনেকটা অস্তিত্ববাদীদের মত। শুনা যায় প্যারিসে থাকা কালীন তার সাথে অস্তিত্ববাদী উপন্যাসিক আলবেয়ার ক্যামুর বন্ধুত্ব হয়েছিল। যদিও তার কবিতায় দু'জন প্রাক-সক্রাতেস যুগে দার্শনিকের উল্লেখ পাওয়া যায়। পোথাগোরাস ও হেরাক্লিতস। এদেরমধ্যে হেরাক্লিতস তার এক কবিতার শিরোনাম। সবকিছুই বয়ে চলে' এটা ছিল হেরাক্লিতসের বিখ্যাত উক্তি। বির্বতনবাদী দার্শনিকের উল্লেখ পাওয়া যায়। হেরাকিতস মনে করতেন 'নিশ্চয়ই কোন একধরনের বৈশ্বিক প্রজ্ঞা রয়েছে যার নির্দেশনা অনুযায়ী সবকিছু ঘটে । তাকে তিনি ঈশ্বর না বলে বলতেন 'লোগোস'। এই গ্রিক শব্দটির অর্থ হচ্ছে প্রজ্ঞা। এই প্রজ্ঞা সবকিছুতেই বিদ্যমান। এবং হেরাকিতসের আরও একটি বিখ্যাত ধারনা হচ্ছে 'সবকিছু এগিয়ে যাচ্ছে একটা দ্বন্ধ তথা বৈপরিত্যের মধ্য দিয়ে। বস্তুর ক্রম বিন্যাসে ভাল আর মন্দ এই দুয়েরই যার যার স্থান রয়েছে। বৈপরিত্যের এই নিত্য আন্তসম্পর্ক না থাকলে জগতের অস্তিত্ব থাকত না। দিন আর রাত,শীত আর গ্রীষ্ম,যুদ্ধ আর শান্তি, ক্ষুধা আর পরিতৃপ্তি এই হচ্ছে লোগোস।
মিউশের মতে' সে যেই হোকনা কেন। যখন ভোর হয়ে আসে সে দেখছিল ভাঁজখোলা পাহাড় গুলো/....দিনের পর দিন। আর সে খেয়াল করার আগেই বছরের পর বছর/... সে কার জন্য, সে ভেবে ছিল, এমন ঐশ্বর্য্য? শুধু আমার একার জন্য?/অথচ আমি মরে যাবার অনেক পরেও তো থেকে যাবে এই সব/... আমিই যদি সমগ্র মানব জাতি,ওরা কি তবে'তারা'আমাকে বাদ দিয়েই?/
মিউশ রুশ, স্লাভ পোলিশ না আমেরিকান সেটা কোন ব্যাপারই নয়। সত্য কথা হচ্ছে যে তিনি বিংশ শতাব্দির মহৎ আধুনিক কবিদের একজন হয়েও আধুনিকোত্তর। কারণ শেষ পর্যন্ত আশাবাদীতাই তার কন্ঠস্বর। তাকে মহত্তম বলেছেন আর এক রুশ নোবেল প্রাপ্ত কবি যোশেফ ব্রদস্কি। সম্ভবত:কবিরা ভিন্ন তাদের কন্ঠস্বরের কারণে, আঙ্গিকের কারণে, নইলে সব মহৎ কবিরাই এই পৃথিবীকে মানুষের বাসযোগ্য অথবা ন্যায়ের শাসনে আলোকিত দেখতে চেয়েছেন। বাংলাভাষার বিষাদাচ্ছন্ন কবি জীবনানন্দ দাশেরও এত যে বিষাদ। তিনিও শেষ পর্যন্ত ঘুম থেকে উঠে বলেছেন'আমরা তিমির বিনাশী'? অনেক পথ পাড়ি দিতে হয় কবিকে। যেন সে কোন গভীর সামুদ্রিক ইলিশ ঢেউয়ের তরঙ্গ ভেঙ্গে ভেঙ্গে মাৎসান্যায়ের ভয় থেকে দূরে তার ডিম পাড়ার জন্য তাকে খুজে নিতে হয় নিস্তব্দ তরঙ্গবিহীন কোন নদী। কারণ ইলিশ মাতা চান তার সব সন্তান যেন বেঁচে থাকে। মিউশও তেমনি। তার সময় তাকে বলে দিয়েছে কোথায় তাকে পালাতে হবে বুকে কবিতা সৃষ্টির ডিম নিয়ে। প্লাতনীয় সক্রাতেসের পরামর্শ স্বত্বেও কবিতা বেঁচে আছে, যতদিন ভাষা বেঁচে আছে, শব্দ বেঁচে আছে, মানুষ কথা বলছে, কবিদের শেষ নাই। বিনাশ নাই। মিউশ মারা গেছেন ২০০৪ সালের ১৪ আগস্টে। তাঁর কবিতাসমুহ খুজে নেবে কোন ইপ্সিত কবিকে। সেও মিউশের মত বলবে

' আর তুমি যা কর সেতো একই কথা বারে বারে আওড়ানো/ যদি শুধু যথেষ্ট সময় থাকত/ যদি শুধু যথেষ্ট সময় থাকত/ কোন মন্দিরের স্তম্ভ গুলোর মধ্য দিয়ে শুদ্ধিরণের উৎসবে/ লোকের জমায়তকে পথদেখিয়ে
নিয়ে যেতে পছন্দ করতে তুমি/ শুদ্ধিকরণের উৎসব? কোথায়? কখন? কার জন্য?